বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই তিন বোন এসবের প্রতিবাদ করেছিলেন। রাফায়েলের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে তাঁরা গোপনে লিফলেট বিতরণ করতেন। গুম হওয়া লোকদের তালিকা বিলাতেন। গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। তিন বোনের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, দেশের বাইরেও। মিরাবেল বোনেরা ক্রমশ হয়ে উঠছিলেন গণতন্ত্র আর নারীবাদের প্রতীক। দেশের মানুষ ভালোবেসে তাঁদের ডাকতে শুরু করেছিল ‘লা মারিপোসাস’ বা ‘আমাদের প্রজাপতিরা’ বলে! ক্রমশ একনায়ক শাসক রাফায়েলের জন্যও বিরাট হুমকি হয়ে উঠছিলেন তাঁরা। তাই ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর এই তিন বোনকে রাস্তার পাশে একটি ঝোপে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর লাশগুলো জিপে উঠিয়ে নেওয়া হয়। পরে লাশগুলো নামিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দেখতে দুর্ঘটনার মতো লাগে।

কিন্তু তাঁদের দেশের মানুষ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে ফুঁসে ওঠে। দিকে দিকে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মিরাবেল বোনদের হত্যার ছয় মাস পরই ডমিনিকান রিপাবলিকে একনায়কত্বের অবসান ঘটে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায় দেশ। সেই সঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হন প্রজাপতি বোনেরা।

এই প্রজাপতি বোনদের স্মরণে ১৯৯৯ সাল থেকে ২৫ নভেম্বর জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করছে। এই দিন পৃথিবীর সর্বত্র রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠার দিন। ইন দ্য টাইম অব বাটারফ্লাইস নামের অপূর্ব চলচ্চিত্রে এই নৃশংস ঘটনার চিত্রায়ণ হয়েছে, যেখানে মিনার্ভা মিরাবেল চরিত্রে অভিনয় করেছেন সালমা হায়েক।

আমি আমার নিজের মৃত্যুশয্যায় ঘুমাই

কোভিডকালে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অঘোষিত লকডাউনের সময় গত বছর কেবল মে মাসে ৩১ দিনে দেশের ৫৩টি জেলায় ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। ১১ হাজার ২৫ জন, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে স্বামীর হাতে। (সূত্র: মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন)। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। (সূত্র: প্রথম আলো)। ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসে ২৩৫ জন নারীকে স্বামী বা স্বামীর পরিবার হত্যা করেছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়।

কেবল কি স্বামীর হাতে বা পারিবারিক নির্যাতন? সাম্প্রতিক কালে নারীর প্রতি অন্যদের নির্যাতন ও সহিংসতার অস্বাভাবিকতাও মাত্রা ছাড়িয়েছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে কয়েকজন যুবকের অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও চিত্র, সিলেটে এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া নববিবাহিত তরুণীকে নির্যাতন বা ছেলেধরা সন্দেহে সর্বসমক্ষে দিবালোকে একজন নারীকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে এই দেশে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে গাছে বেঁধে নারী বা কিশোরীদের পেটানো ও নির্যাতন করার দৃশ্য।

নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থান কোনো রকমফের করে না নারীদের ক্ষেত্রে। দরিদ্র থেকে ধনী, উচ্চশিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত, গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র সহিংসতার শিকার নারীরা। নোয়াখালীর গৃহবধূ আর রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী—দুই-ই সমাজের কাছে কেবল ছিঁড়েখুঁড়ে ভোগ করার শরীর মাত্র। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কি বিচার পাব না?’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে তাই পারুলকে দাঁড়াতে হয় প্রেসক্লাবের সামনে। কিন্তু বিচার পাবে কি, বিচারপ্রার্থী নারীকে অবিশ্বাস, পরিহাস বা অপমান করারও সুযোগ ছাড়ে না সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান! রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলায় সুস্পষ্টভাবে নির্যাতিত নারীকেই তাই চূড়ান্তভাবে অপমান করা হয়, অবিশ্বাস করা হয়। বিচার চাওয়া আর জানাজানির কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ মিডিয়ায় ভীষণভাবে অপদস্থ ও অভিযুক্ত হতে হয় নারীকে।

পরিবার বা পথে-ঘাটেই নয়, নারীরা কর্মক্ষেত্রেও নানা সহিংসতার শিকার হন। সাম্প্রতিক কালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সময় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০২০-এর সেপ্টেম্বর মাসে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমকে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্ত। করোনাকালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানামুখী নিগ্রহের শিকার হয়েছেন নারী চিকিৎসক ও নার্সরা। এ বছর ৩১ জানুয়ারি ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স এবং একজন মিডওয়াইফকে মারধর ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন রোগীর স্বজনেরা। এই সব জায়গায় নারীর ক্ষমতায়ন ঘটলেও এখনো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়নি। তাই ক্ষমতাসীন নারীরাও সহজেই নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।

আমি কি বিচার পাব না?

আমি কি বিচার পাব না—প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানো পারুল আজও বিচার পাননি। নারীর প্রতি সহিংসতা আর নির্যাতনের চরম অবস্থায় এই করোনাকালেই ২০২০-এর অক্টোবরে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৩ অক্টোবর এটি আইনে পরিণত হয়।

কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের আইন হলেই কি চিত্র পাল্টে যাবে? বিচার ও আইনব্যবস্থা যেখানে এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি, বিচারপ্রার্থী নারী নিজেই যেখানে প্রশ্নে জর্জরিত আর চরম অবমাননার শিকার, সমাজ যেখানে ‘কেন নারীটি নির্যাতিত হলো’—এ প্রশ্নের উত্তর ও ব্যাখ্যা দাবি করে সেই নারীর পোশাক বা চলাফেরা বা অবস্থানের কাছেই। যত দিন সমাজের চোখ না বদলেছে, তত দিন বিচারের আশা বালুকায় হারিয়ে যাওয়ার মতোই।

প্রজাপতিরা ভালো থেকো

আজ থেকে ৬০ বছর আগে নির্মম নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছিলেন প্রজাপতি বোনেরা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তাঁদের অপরাধ। কিন্তু এই হত্যা বাক্‌রুদ্ধ করতে পারেনি প্রজাপতিদের। পৃথিবীর কোণে কোণে, দেশে দেশে তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছেন এই বার্তা—মেয়েদের হত্যা করে, নির্যাতন করে সভ্যতা এগিয়ে যেতে পারবে না। মিরাবেল বোনদের অনুসারী হয়ে যুগে যুগে এসেছেন ইলা মিত্র, প্রীতিলতা, তারামন বিবি, জাহানারা ইমামরা। রঙিন প্রজাপতিরাই সাহস, শক্তি আর প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছেন। আমাদের বাগান পুষ্পমঞ্জরিত হোক না হোক, প্রজাপতিরা ভালো থেকো। প্রতিবাদটা জারি রেখো। একদিন এই বাগানে ফুল ফুটবেই।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন