default-image

ভলগা নদীতে তখন জমাট স্রোত। সন্তানকে বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন লেখা নামের এক নারী। উঠে আসার সময় একটি শক্ত হাত চেপে ধরেছিল লেখার কণ্ঠনালি। ভলগার স্রোতে তলিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পৃথিবীর সব কন্যাই যেন নদীর সঙ্গে কথা বলতে আসে। “বহু দিন, মাস, ঋতু শেষ হ’লে পর পৃথিবীর সেই কন্যা কাছে এসে অন্ধকারে নদীদের ক’থা কয়ে গেছে।”

রাজধানীর ও লেভেল পড়ুয়া প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী মেয়েটি হয়তো শেষ মুহূর্তেও বিশ্বাস করতে পারেনি, এত দ্রুতই এভাবে ফুরিয়ে যাচ্ছে জীবনের সব গল্প। নিস্তেজ হয়ে যেতে যেতেও হয়তো বিশ্বাস রেখেছিল, এখনো তার জন্য অপেক্ষা করছে এক স্থির আলো। কিন্তু তা আর ঘটেনি। লাশকাটা ঘরে বয়স নিয়েও ছিল জটিলতা। এই সব মৃত্যু বড় বেশি ম্লান করে দিয়ে যায় বারবার আমাদের। পৃথিবীর ক্ষত হয় আরও গভীর।

বিজ্ঞাপন

কলাবাগানের বাসায় সেদিন কী ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যা–ই ঘটে থাকুক, নির্ভরতার দুই হাতকে হন্তারকের হাত হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা নারীর জীবনেই ঘটে। বিশৃঙ্খল সমাজে নির্যাতিতের শ্রেণি থাকে না, তবু সব ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত নারী—এ কথার সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ থাকলে বরং সান্ত্বনা পাওয়া যেত।

এই ভূখণ্ডের প্রদোষকালে কুসুম ডোমনীর শরীরে তপ্ত লোহা প্রবেশ করিয়েছিল সামন্তরা। স্বৈরিণী আখ্যা দিয়ে কুসুমকে হত্যার সময় তাঁর দুই শিশুপুত্র দাঁড়িয়েছিল সামনেই। প্রদোষকালে পুনর্ভবা, আত্রেয়ী বা করতোয়ার তীরের বিস্তীর্ণ ভূভাগের জনপদগুলোর একই রকম অবস্থা ছিল বলে বর্ণনা করেছেন সাহিত্যিক শওকত আলী।

‘নিশা’ গোষ্ঠীর গোত্র অধিকার সুরক্ষা নিয়ে লেখার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছিলেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন। মাতৃপ্রধান পরিবারে নারীর প্রাণহানির সে ঘটনার হাজার হাজার বছর পরও আদতে খুব কি বদলেছে নারীর প্রতি সহিংসতা?

শরীয়তপুরের হেনা থেকে কুমিল্লার তনু। ভারতের নির্ভয়া হত্যাকাণ্ড, হাজার বছর ধরে একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। ২০১১ সালে শরীয়তপুরে নড়িয়ায় নিহত কিশোরী হেনা আক্তার হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। হেনাকে ধর্ষণকারী মাহবুব দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন খোলা হাওয়ায়। অথচ সে কিশোরীর জন্য মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি নির্যাতন। ময়নাতদন্তের জন্য পদ্মাপারে হেনার মরদেহ আবার তোলা হয়েছিল কবর থেকে।

এমন নয় যে শিশু বৃদ্ধ বা পুরুষ নির্যাতিত হয় না, কিন্তু পারিবারিক নির্যাতন, গ্রাম্য সালিসের বিচার, যৌতুক, সামাজিক অনিরাপত্তা, যৌন নির্যাতনে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারানোর ঘটনাটি নারীর জন্যই অপেক্ষা করে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে অর্থনীতি, প্রভাব রাখে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এত আইন থাকার পরও নির্যাতন নৃশংসতা তো বন্ধ হচ্ছেই না বরং শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বাড়ছে মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও। শুধু শাস্তি নয়, প্রয়োজন অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটিও উঠে আসা।

default-image
বিজ্ঞাপন

এসব ক্ষেত্রে কখনো কখনো ‘মব সাইকোলজি’ও ঘটিয়ে ফেলতে পারে ভয়াবহ ঘটনা। কিছুদিন আগে বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন রেণু নামের এক মা। অথচ রেণু গিয়েছিলেন সন্তানকে স্কুলে ভর্তির খবর নিতে। সেদিনের ঘটনায় রেণুর হামলাকারীর মধ্যে হয়তো এমন মানুষও ছিল, যে কখনো কারও শরীরে হাত তোলেনি। আমরা কখনো জানতে পারব না, এই পৃথিবীর প্রতি কতখানি অবিশ্বাস আর ঘৃণা জন্মেছিল রেণুর। আঘাতকারী মানুষদেরও তো আছে পারিবারিক পরিচয়।

এই যে আত্মবিস্মৃত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এ হচ্ছে নিজের সাফল্যের স্মৃতি ভুলে শুধু ক্ষোভ আর পরাজয়কে লালনের সংস্কৃতি, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশের পরিবেশই শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রয়েছে আত্মমর্যাদা সম্পর্কে অসচেতনতা। দ্রুত ছুটে চলা মানুষ নিজের মুখোমুখি হয় না আর এখন। নির্জন খড়ের মাঠে পৌষের সন্ধ্যা দেখার মতো মন থাকে না আমাদের। তাই কখনো দেখা হয় না, নদীতে নারীর কুয়াশার ফুল ছড়ানোর দৃশ্য।

ও লেভেল পড়ুয়া মেয়েটির মরদেহ দাফনের জন্য ৯ জানুয়ারি কুষ্টিয়া নেওয়া হয়েছে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে। সে নদী জানে ভলগার গল্পও। আমরা বিস্মৃত হলেও সভ্যতার ইতিহাস ঠিক মনে রাখে। নিশা জাতির সেই লেখা নামের নারীর সঙ্গে কোনো ব্যবধান নেই আজকের হেনা বা নির্ভয়ার। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তাঁরা সবাই অবিশ্বাস্য বিষাদের চোখে দেখেছেন পৃথিবী। যে পৃথিবীতে বাস করছি আমরা। তাঁরা জেনেছেন জীবন তাঁদের জন্য উপহার হয়ে আসেনি।

‘পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর।’

মন্তব্য করুন