default-image

শারমিনের তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর। সবচেয়ে ছোট মেয়ের ১১ মাস। ছোট মেয়ে জন্মানোর পরই শারমিনের স্বামী কিছু না জানিয়ে কোথায় যেন চলে গেছেন। তিন মেয়েকে নিয়ে শারমিন এখন তাঁর মায়ের সংসারে আশ্রয় নিয়েছেন।

পেট চালাতে শারমিন রাজধানীর বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ক্রসিংয়ে ফুল বিক্রি করেন। ক্রিসেন্ট লেকের কোনায় শারমিনের বসার জায়গা। পুরোনো একটি সিমেন্টের বস্তা বিছিয়ে ফুল নিয়ে বসেন। রজনীগন্ধার সঙ্গে গোলাপের পাপড়ি মিলিয়ে মালা গাঁথেন। পাশে বসিয়ে রাখেন তিন মেয়েকে। লেকে বেড়াতে আসা লোকজন, পথচলতি ব্যক্তি ও গাড়ির যাত্রীরা শারমিনের ফুলের ক্রেতা।

গত ১৯ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে তিনটা। বেশ কিছু মালা গাঁথা হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যালে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে মালা, আরেক হাতে ছোট মেয়ে ফাতেমাকে কোলে নিয়ে শারমিন ছুটলেন। গাড়ির জানালার কাচে টোকা দিয়ে যাত্রীদের ফুল কেনার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু জানালার কাচ নামে না, অনুরোধে সাড়াও মেলে না।

বিজ্ঞাপন
default-image

মেয়েকে ফুটপাতে বসিয়ে শারমিন আবার মালা গাঁথতে শুরু করেন। ফুল বিক্রি না হওয়ার জন্য করোনাকে দোষারোপ করে বলতে থাকেন, ‘আগের মতো ফুল বিক্রি হয় না। করোনার লাইগা কেউ জানলাই খুলে না। ২০টা মালা বেচতে বেচতেই রাত হয়ে যায়। করোনার আগে সন্ধ্যার মধ্যে ৩০-৪০টা মালা বেচা হইত।’

শারমিনের মা রোজিনা ও ছোট বোন হাসিও বিজয় সরণিতে ফুল বিক্রি করেন। হাসি আগে স্কুলে যেত। এখন আর পড়ালেখা করে না। শারমিনরা আদাবরে থাকেন। এক কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। আগারগাঁওয়ের পাইকারি ফুলের বাজার থেকে কেজি দরে রজনীগন্ধা আর শ হিসেবে গোলাপ কিনে আনেন। করোনার আগে দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হলেও এখন তা ৪০০-৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।

শারমিনদের পাশেই গোলাপ ফুল নিয়ে বসে ছিলেন শাহিনুর বেগম। শাহিনুরের মেয়ে লিমা আকতারের বয়স ১০ বছর। লিমা স্বদেশ মৃত্তিকা আদর্শ বিদ্যানিকেতনে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এখন মায়ের সঙ্গে ফুল বিক্রি করে। শাহিনুর বেগমের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে। স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি। শেরেবাংলা নগরে আনিসের বস্তিতে থাকেন।

শাহিনুর বলেন, ‘জামাই একলা সংসার চালাইতে পারে না। তাই উভয় পক্ষ কাম করি। আগে উদ্যানের (চন্দ্রিমা) ভেতরে বিক্রি করতাম। এখন রাস্তায় বিক্রি করি। ফুলের ব্যবসার কোনো ঠিক নাই। কোনো দিন মোটামুটি লাভ হয়। কোনো দিন ফুল থেকে যায়।’

আগে ঢাকার পথেঘাটে হরহামেশাই ভ্রাম্যমাণ ফুল বিক্রেতা চোখে পড়ত। ইদানীং বিজয় সরণি ছাড়া আসাদগেটের আড়ং ক্রসিং, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই ভ্রাম্যমাণ ফুল বিক্রেতা বেশি দেখা যায়। এই ফুল বিক্রেতাদের অধিকাংশই নারী ও মেয়েশিশু। নিয়মিত গোলাপ ও রজনীগন্ধা আর কালেভদ্রে কাঠগোলাপ, দোলনচাঁপা, কদমের মতো ফুল বিক্রি করেন।

নিশিরা তিন বোন ও দুই ভাই। নিশিদের বাবা আবার বিয়ে করে আলাদা থাকেন। বড় দুই ভাইয়েরও আলাদা সংসার। মা ও নিশিরা তিন বোন থাকে শনির আখড়ার জাপানি বাজার ৫ নম্বর বস্তিতে। ১৫ বছরের নিশি শহীদ মিনার এলাকায় ফুল বিক্রি করে। আর নিশির ছোট বোন ১১ বছরের বৈশাখী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফুল বিক্রি করে।

নিশি একসময় স্কুলে যেত। পড়ালেখা বন্ধ করার পরে কিছুদিন তৈরি পোশাক কারখানাতেও কাজ করেছে। ২৩ ডিসেম্বর দুপুরে নিশির সঙ্গে কথা হয়। সে বলছিল, ‘গার্মেন্টসের লোক ভালো না। তাই ছেড়ে দিছি। আগে বিক্রি ভালো ছিল। এখন খরচ বাদ দিয়ে কোনো দিন ২০০ টাকাও থাকে না।’

বিজ্ঞাপন

নিশির বান্ধবী তিশা। হাড় লিকলিকে, অপুষ্ট শরীর দেখে তিশার বয়স বোঝার উপায় নেই। তবে তার বয়সও ১৫ বছর। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে তিশা বড়। বাবা রিকশাচালক। কামরাঙ্গীরচরের চান মসজিদ এলাকার বস্তিতে থাকেন। প্রতিদিন সকালে তিশার মা সানোয়ারা তিন সন্তানকে নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় চলে আসেন।

সানোয়ারা ছোট ছেলে নাহিদকে নিয়ে শহীদ মিনার এলাকায় বসে থাকেন। আর তিশা ও তার ছোট বোন লিপি ফুল বিক্রিতে নামে। দিন শেষে আবার তিশার বাবা তাদের নিয়ে ঘরে ফেরেন। আগের দিন কেনা ৫০টি ফুলের মধ্যে ২০টি ফুলই অবিক্রীত রয়ে গেছে। তিশা বলছিল, ‘করোনা আইসা আমাদের পেটে লাথি দিছে। কেউ ফুল কিনতে চায় না।’ করোনা যেন ঢুকে গেছে ফুলের সুগন্ধেও।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, অতিক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা করোনায় নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। যাঁরা কাজ হারিয়েছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন