বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই শিক্ষার্থীদের বিশেষ একটা পরিচিতি আছে। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক জীবনের নানা শিক্ষামূলক বিষয় জানার কর্মসূচি ‘জীবনদক্ষতা কর্মসূচিতে’ প্রশিক্ষিত এরা। এই জীবনদক্ষতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ পরিচালিত ইউএসএআইডির অর্থায়নে ‘নবযাত্রা প্রকল্প’।

রাজমিস্ত্রি বাবার এই মেয়েটির বাড়ি স্কুল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকেই নিয়মিত ক্লাসে আসা–যাওয়া করতে হতো মেয়েটিকে। গত জুলাই মাসের ঘটনা। মেয়েটির বিয়ে ঠিক করেন তার বাবা ও ভগ্নিপতি। মেয়েটি অভিভাবকদের বলে, লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে করবে না। সে কথা কানে তোলেন না তাঁরা। শুরু হয় বিয়ের তোড়জোড়। মেয়ের ওপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

মেয়েটির কথা, ‘যখন আর কোনো পথ দেখলাম না, তখন পালালাম। ফোন করলাম ৯৯৯ নম্বরে। প্রশাসনের সহায়তা চাইলাম। আমরা প্রশিক্ষণে জেনেছিলাম, কোনো বিপদে পড়লে এ নম্বরে ফোন করতে হয়।’

বাল্যবিবাহের বিষয়টি জানার পর উপজেলা প্রশাসন তৎপর হয়। উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তরে নিয়ে আসা হয় মেয়েটিকে। ডাকা হয় তার বাবা-মাকে। সবার উপস্থিতিতে বাবা–মা মুচলেকা দেন ‘১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেবেন না।’ সেখানে প্রত্যয়ী মেয়েটি বলে, ‘১৮ বছর বা প্রাপ্তবয়ষ্ক হলেও ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই জোর করে বিয়ে দেওয়া যাবে না।’একটি মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হলে তার মানসিক ও শারীরিক নানা ক্ষতির কথা স্পষ্ট করে বলে মেয়েটি। ওর বাল্যবিবাহ ঠেকানোর ঘটনা এ স্কুলে অনেককেই সাহসী করেছে। স্কুলের এক শিক্ষার্থী সাবিহা বলে, ‘এ ঘটনা উদাহরণ। এখন কেউ আর আমাদের বিপদে ফেলার সাহস করবে না।’

কিছুটা আনুষ্ঠানিকই ছিল এই সাক্ষাৎ। ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবযাত্রা কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ের কাজ দেখতে এসেই এখানে আসা। বাল্যবিবাহের প্রায় শিকার এই মেয়ে বা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কিছুটা আগেই জানত এই অনুষ্ঠানের বিষয়ে। কিন্তু ওদের কথার স্বতঃস্ফূর্ততা, দৃঢ়চেতা মনোভাব বলছিল, এ তাদের মনের কথা।

স্কুলের শিক্ষার্থী ফাহিম জানায়, এই জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণে বাল্যবিবাহের কুফল, নিরাপদ পানির ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ স্যানিটেশন, প্রজনন স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ২৪টি সেশন হয়। এখানে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে শেখা, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক হয়। শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ‘জীবনদক্ষতা’ কর্মসূচির যে একটা ভূমিকা আছে তা স্বীকার করেন এ স্কুলের শিক্ষক মো. মাহমুদুন নবীও।

কালীগঞ্জ উপজেলার ৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জীবনদক্ষতা চালু আছে। প্রতিটি স্কুলে তিনটি ব্যাচকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয় বলে জানান ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবযাত্রার কর্মসূচির কালীগঞ্জের অপারেশনস ম্যানেজার আশিক বিল্লাহ। তাঁর কথা, ‘বাল্যবিবাহের ঠেকানোর পর ওই শিক্ষার্থীর দিকে দৃষ্টি রাখার কাজ করছি আমরা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বেশি দরকার সরকারি নজরদারি। কারণ তাদের হাতে আইনি ক্ষমতা আছে।’

কালীগঞ্জের মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অর্না চক্রবর্তী জানান, সরকারি স্তরে পর্যবেক্ষণের সুযোগ না থাকলেও অধিদপ্তরের নিবন্ধিত দুটো বেসরকারি সংস্থাকে তিনি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন। এমন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠনের একটি প্রেরণা। এর নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী মেয়েটিকে প্রাথমিক পর্যায়ে সহযোগিতা করেছিলেন। শম্পা বললেন, ‘সাহসের ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর আমরা এ ধরনের মেয়েদের স্বাগত জানাই। কিন্তু বিয়ে ঠেকানোর পর দেখভালের দায়িত্ব প্রশাসনের তরফে নেওয়া উচিত।’

করোনাকালে দেশে বাল্যবিবাহের ঘটনা বেড়েছে। দারিদ্র্য এর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয় সব সময়। যে শিশুদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তারাও জানায়, স্কুল না খোলা থাকায় অনেককেই শিশুশ্রমেও দেখা গেছে। অনিশ্চয়তার ফলে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও আছে। আর বিয়ে আটকানোর পর সামাজিক নিগ্রহের ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন