রাতের বাতাসে হাওরের পানির ঢেউ বাড়ে। মাটির ঘরের দেয়ালের ওপর ঢেউ আছড়ে পড়ে। মনে হয় এই বুঝি ঘর হেলে পড়ল। গত জুন মাসে বন্যার সময় শেলেনা বেগমের (৩৮) বাড়ির অবস্থা এমনই ছিল। প্রথমে কয়েক দিন নিজের ঘরেই কষ্ট করে পরিবারের অন্যদের নিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু ঘরে ছিল হাঁটুপানি। একটা ভীতি নিয়ে ঘুমহীন কাটত রাত। এরপর টানা ১৮ দিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে হয়েছে তাঁদের।

সেই আত্মীয়ের বাড়িতে ছয়টি পরিবারের সদস্যদের থাকতে হতো এক ঘরে। এ কষ্ট তা–ও মানা যেত। কিন্তু বড় সমস্যা ছিল মাসিকের সময়। শেলেনার শুধু একার সমস্যা নয়। ১৫ বছর বয়সী এক মেয়ে সুরমা বেগমকে নিয়েও বিপদ। এক শৌচাগার এত মানুষ ব্যবহার করত। মাসিকের কাপড় পাল্টানোর তীব্র প্রয়োজনেও তা পরে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেলেনা বেগমের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সংগ্রামপুর গ্রামে। সুনামগঞ্জে জুন মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া প্রথম দফা বন্যাতেই তাঁদের ঘরে পানি ওঠে। পরে আরও দুই দফা বন্যায় একইভাবে ঘরে পানি প্রবেশ করে। শেলেনার স্বামী ফয়জুল হক হাওরে মাছ ধরে সংসার চালান।

default-image
বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিক সময়েও এটা সমস্যা

দুর্যোগের সময় শেলেনা বেগম বা সুরমার যে কষ্টের অভিজ্ঞতা, তা দেশের অজস্র নারীর জীবনে ঘটে। শুধু তো দুর্যোগকালে নয়, কিংবা শুধু নিম্নবিত্তের নারীদের জীবনে নয়। নারীর মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ধনী–দরিদ্রনির্বিশেষে এখন এক বড় সমস্যা। আগের তুলনায় স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড ব্যবহারের হার বাড়লেও এখনো দেশের ৬০ শতাংশের বেশি নারী ব্যবহার করেন পুরোনো কাপড়। এরই মধ্যে এবার এসেছে করোনা মহামারি। একাধিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই মহামারি এনেছে দারিদ্র্য। নারীর মাসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে এই প্রাকৃতিক ঘটনা এখনো আবৃত। এ–সংক্রান্ত ধারণা বা শিক্ষা না থাকায় বিপুলসংখ্যক কিশোরী এই অসহনীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। আর আজ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত উচ্চ করের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্যাড এক বিলাসসামগ্রী অনেকেরই কাছে।

করোনাকালে সমস্যা বেড়েছে

করোনাকাল নিম্নবিত্তের অনেক নারীর জীবনে বড় ধরনের কষ্ট বয়ে এনেছে। এর প্রভাব পড়েছে তাঁদের মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায়। রাজধানীর মিরপুরে থাকেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক কাজল আখতার। করোনার আগে তিনি যে বস্তিতে থাকতেন, সেখানে এক এনজিওর মাধ্যমে জেনে প্যাড ব্যবহার শুরু করেছিলেন। এপ্রিল ও মে—এই দুই মাস মজুরির অর্ধেকও পাননি। এরপর মাসের বিশেষ দিনগুলোতে শুরু হলো পুরোনো কাপড়ের ব্যবহার। কাজল বলেন, ‘আগে তো খাবারের ব্যবস্থা করতে হইব। তারপর না প্যাড। একটা অভ্যাস হয়্যা গেছিল। কিন্তু কী করমু, বাধ্য হইছি।’

করোনাকালে নিম্নবিত্তের কিশোরী ও নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিয়ে একটি জরিপ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। ‘মিনস্ট্রুয়াল হেলথ অ্যান্ড হাইজিন: চ্যালেঞ্জেস অ্যাসোসিয়েটেড উইথ কোভিড–১৯ প্যানডেমিক ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের এই জরিপ চালানো হয় মে মাসে। এতে মোট ৩০ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপে অংশ নেন নিম্ন আয়ের নারী, গার্মেন্টস কর্মী, শহরের মেয়ে শিক্ষার্থী, গ্রামের মেয়ে শিক্ষার্থী, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই নারীদের বয়স ১৬ থেকে ৪৫ বছর।

ওয়াটারএইডের হেড অব প্রোগ্রাম আফতাব ওপেল প্রথম আলোকে বলেন, মে মাসের পর পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে তখন নারীর যে স্বাস্থ্য সমস্যা ঘটেছে, এর রেশ টানতে হচ্ছে অনেককেই।

করোনাকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গত ১৮ আগস্ট ‘লাইভলিহুড, কোপিং অ্যান্ড রিকোভারি ডিউরিং কোভিড-১৯’ শীর্ষক জরিপভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। এ গবেষণা করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।

বিজ্ঞাপন
স্যানিটারি ন্যাপকিনের আমদানি
  • দেশে ৬৫ শতাংশ স্যানিটারি ন্যাপকিন আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।

  • ২০১৯–২০ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৮২৫ টন। মূল্য ছিল ৪১ কোটি টাকা। আর এ পণ্য আনতে শুল্ক করের পরিমাণ ৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

  • ২০১৮–১৯ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ২১ লাখ টাকার প্যাডে শুল্ক কর দিতে হয়েছে ৪২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

  • শুল্কহার ১২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।

সূত্র: চট্টগ্রাম কাস্টমস

গবেষণায় বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসে শহুরে দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে ৪৩ শতাংশ, গ্রামের মানুষের আয় ৪১ শতাংশ আর পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় কমেছে ২৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে ১৭ শতাংশ জুনে এসে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাসাবাড়িতে কাজ করতেন যেসব মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগই নারী—তাঁদের ৫৪ দশমিক ১৯ শতাংশ কাজ হারিয়েছেন। করোনাকালে নারীর মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার হাল নাজুক হয়ে পড়েছে। তবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও এটি বড় এক সমস্যা।

এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্যাড নয়

একজন নারীর জীবনে গড়পড়তা তিন হাজার দিন মাসিক থাকে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৭ সালে হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি নারীর বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। এর অর্থ, জনসংখ্যার বিপুল পরিমাণ নারী নিয়মিত মাসিকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এখনো ৬০ শতাংশের বেশি নারী প্যাড ব্যবহার করেন না বা করতে পারেন না। এ নিয়ে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশও নেই।

মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিয়ে একেবারে সাম্প্রতিক দলিল বিবিএসের স্বাস্থ্যবিধি জরিপ ২০১৯। এখানে দেখা যাচ্ছে, স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের মধ্যে এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে। প্যাড ব্যবহারের পরিমাণ ৫৫ শতাংশ। বাকিরা নতুন কাপড় ব্যবহার করে। মাসিক হওয়ার আগে এ সম্পর্কে জানত ৫৩ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া কিশোরী। এদের মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জানার হার ৬৩ শতাংশ, প্রাথমিক পর্যায়ের ৩৭ শতাংশ। এ সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের মধ্যে তেমন কোনো বড় ব্যবধান নেই।

৩৬ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া কিশোরী জানায়, তাদের স্কুলে এ–সংক্রান্ত ক্লাস নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ হার মাত্র ১১, আর মাধ্যমিকে এ হার ৫১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংগঠন সিমাভির অন্যতম কাজ নারীর স্বাস্থ্য পরিচর্যা। সিমাভির বাংলাদেশি সমন্বয়ক (ওয়াশ প্রোগ্রাম) অলোক কুমার মজুমদার বলেন, স্কুল পর্যায়ে মাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাসংক্রান্ত ধারণাদান এখনো ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। স্কুলে মেয়েদের আলাদা শৌচাগার করার ক্ষেত্রেও এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি।

সহায়ক পরিবেশের অভাব

বিবিএসের জরিপে দেখা যায়, এখনো ৪২ শতাংশ স্কুলে মাসিকের কাপড় পাল্টানোর জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা বা শৌচাগার নেই। ৬০ শতাংশের মতো কিশোরী খুব গোপনে এটি শুকাতে দেয়। মাসিকের কারণে অন্তত ৩০ শতাংশ কিশোরী আড়াই দিন স্কুলে যেতে পারে না। আবার ৬৬ শতাংশ কিশোরীকে কোনো না কোনো বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হয়।

ওয়াটারএইডের বাংলাদেশি প্রধান হাসিন জাহান বলেন, সামাজিক ট্যাবু এখনো ঘিরে আছে এই বিষয়। তবে এই সামাজিক বিধিনিষেধের মতোই প্যাডের দাম একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য। এ জন্য সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে।

এটি কোনো বিলাস পণ্য নয়

প্যাডকে অত্যাবশকীয় পণ্য এখনো বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এটি কোনো বিলাসসামগ্রী নয় বলে মত দিলেন হাসিন জাহান। তিনি বলেন, ‘এই বিবেচনা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকতে হবে। এতে আরোপিত সব ভ্যাট বা শুল্ক তুলে নিয়ে আমাদের দেশে সহনীয় দামে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

স্যানিটারি ন্যাপকিন কোনো বিলাস পণ্য নয়—এ কথা বলেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, প্যাড নিত্যপ্রয়োজনীয়, আবশ্যকীয় পণ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ পণ্যে কোনো ধরনের ভ্যাট আরোপের বিরোধী। বিদেশ থেকে আনা এ পণ্যে কিছু শুল্ক আরোপ হয়তো দেশি শিল্পকে উৎসাহিত করতেই করা হয়েছে। তবু এর পরিমাণ বেশি।

ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর স্বাস্থ্য পরিচর্যার এ পণ্যের দাম যাতে কম হয়, এর দিকে দৃষ্টি দেবেন বলেও জানালেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0