কংগ্রেস টুডু ও আদরী মার্ডির মুখের এ হাসি বদলে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি, সে বদলের গল্প অনুপ্রেরণার
কংগ্রেস টুডু ও আদরী মার্ডির মুখের এ হাসি বদলে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি, সে বদলের গল্প অনুপ্রেরণার শহীদুল ইসলাম

৯ বছর আগের কথা। নিমঘুটু গ্রামে বাড়ির বাইরে এক সাঁওতাল দম্পতির মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে। তা দেখে এক পথচারী থামলেন। ভাষা না জানায় কিছুই বুঝতে পারলেন না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই দম্পতি নিঃসন্তান। স্ত্রীর সমস্যার কারণে সন্তান হয়নি—এমনটা ভেবে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাচ্ছেন স্বামী। দুজনই দিনমজুর, চিকিৎসা করাবেন, সে টাকাও নেই। এই নিয়ে বিবাদ।

পরের কাহিনি রূপকথার মতো। সেই পথচারী গোদাগাড়ীর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার তাঁদের একটা কাজের খোঁজ দেন। সেই কাজ তাঁদের ভাগ্য বদলে দেয়। যে নারীকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিল, ছয় বছরের মাথায় তিনি পান ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার’। এর দুই বছর পর তিনি সন্তানের মা হন। এখন তিনি গ্রামের ‘আদর্শ কিষানি’। তাঁকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। গ্রামটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নে।

বিজ্ঞাপন
default-image

কৃষিকাজে এলেন যেভাবে

এই নারীর নাম আদরী মার্ডি। তাঁর স্বামীর নাম কংগ্রেস টুডু। আদরী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। আর কংগ্রেস সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। ২০০৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। সে সময় কংগ্রেসের ভিটে ছাড়া আবাদের কোনো জমি ছিল না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অন্যের জমিতে কাজ করতেন। বিয়ের ছয় বছর পার হয়ে যায়, কোনো সন্তান হয় না। কংগ্রেস অধৈর্য হয়ে ওঠেন। তিনি ভাবেন স্ত্রীর সমস্যার কারণেই তিনি বাবা হতে পারছেন না। এ জন্য চিকিৎসকের কাছেও গেছেন তাঁরা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এ টাকা তাঁদের নেই।

অশান্তি শুরু হয় এই সাঁওতাল দম্পতির সংসারে। কংগ্রেস স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে আরেকটি বিয়ে করতে চান। তুমুল ঝগড়ার এক দিনে তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন অতনু সরকার। তিনি তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে বিষয়টি জানান। তখন ওই উপজেলায় ‘দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প (এসসিডিপি)’ চালু হয়েছে। তাঁরা আদরী মার্ডিকে ওই প্রকল্পের একটি গ্রুপের সদস্য করে নেন। তাঁকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ওপরে প্রশিক্ষণ দেন। এর মাধ্যমে আদরী মার্ডি ভালো বীজ, ভালো জাত, উত্তম সার ব্যবস্থাপনা, ফুলের কৃত্রিম পরাগায়ন, নিমপাতা দিয়ে জৈব বালাইনাশক ও কেঁচো সার তৈরির প্রযুক্তি শিখে যান।

দ্রুতই এল সাফল্য

আগে বরেন্দ্র অঞ্চলে শুধুই ধান হতো। ধান চাষে অনেক পানি লাগে। এসসিডিপি প্রকল্পে কম পানিতে হয় এ রকম লাভজনক অন্য ফসল চাষের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। আদরী মার্ডি প্রথমে অন্যের এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ শুরু করলেন। পরের বছর টাকা দিয়ে জমি ইজারা নিয়ে আবাদ শুরু করলেন। তাঁর আয় বাড়তে থাকে। এরপর দুই বিঘা জমি কিনে ফেলেন। নিজের থাকার মতো শুধু একটি কুঁড়েঘর ছিল। সেটি বদলে ফেললেন। তাঁর এই সাফল্যের কারণে এসসিডিপি প্রকল্পের ২০১৬ সালের বর্ষপঞ্জিতে আদরী মার্ডির ছবি ব্যবহার করা হয়। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারের জন্য আদরী মার্ডির নাম প্রস্তাব করা হয়। ২০১৭ সালে এই পুরস্কার পান। জুলাই মাসে এ পদক নিতে আদরী ঢাকায় যান।

সেবার ১৪২১ ও ১৪২২ বঙ্গাব্দের পুরস্কার একসঙ্গে দেওয়া হয়। যাঁরা এ পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের ছবি দিয়ে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, আদরী মার্ডি রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘুটু গ্রামের একজন আদর্শ কিষানি। গৃহবধূ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তাদের পরামর্শে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজেকে কৃষি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করেন। কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এক হেক্টর জমিতে মরিচ, শিম, পুঁইশাক ও সজনে ইত্যাদি চাষ করে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। আদরী মার্ডি ফসলের পাশাপাশি কেঁচো সার ও নানা রকম জৈব সারও উৎপাদন করেছেন। উৎপাদিত শাকসবজি, কেঁচো সার ও অন্যান্য জৈব সার বিক্রি করে ১৪২১ বাংলা সনে তাঁর নিট আয় হয় ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। এসব সাফল্যের কারণে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১’–এ রৌপ্যপদক পেয়েছেন। পদকের সঙ্গে ৫০ হাজার টাকাও পুরস্কার পান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আদরী ও কংগ্রেসের বাড়িতে

২ নভেম্বর আদরী মার্ডি ও কংগ্রেস টুডুর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পদক নেওয়ার ছবিটা লেমিনেট করে বাড়ির দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার ওপর একটি জবা ফুলের মালা। কংগ্রেস টুডু স্যুটকেসের তালা খুলে পদক দেখালেন। পদকের একদিকে লেখা রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক, বাংলাদেশ’। অন্যদিকে লেখা ‘১৪২১ বঙ্গাব্দ’। মাঝখানে মনোগ্রাম। নিচে লেখা ‘আদরী মার্ডি মহিলা উদ্যোক্তা’।

চলতি মৌসুমে আদরী মার্ডি পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা নিজের। আর তিন বিঘা বর্গা নেওয়া। তবে তাঁরা কেঁচো সার উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। কেন বন্ধ করেছেন, জানতে চাইলে কংগ্রেস টুডু বললেন, ‘লেনডেথ’ এখন ‘ডাংরা’ হয়ে গেছে। সাঁওতালি ভাষায় কেঁচোকে লেনডেথ আর গরুকে বলা হয় ডাংরা। সংসারে উন্নতি হওয়ার পর কংগ্রেস কেঁচো সার উৎপাদন বাদ দিয়ে গরু পোষা শুরু করেছেন। এতে লাভ বেশি। এবার ছিল তাঁর আটটি গরু। ঈদুল আজহার সময় পাঁচটি বিক্রি করেছেন। এখন তিনটি আছে।

দৃষ্টান্ত যখন আদরী মার্ডি

এখন আদরী মার্ডির পরামর্শ নিয়ে গ্রামের অনেক গৃহিণীই এগিয়ে যাচ্ছেন। ফসলের প্রতি মৌসুমে সবাই আদরীর কাছে পরামর্শ নেন। গত ৩১ আগস্ট তাঁদের শেষ পরামর্শ বৈঠক হয়েছে। আদরী মার্ডির পরামর্শ নিয়ে সফলতা পেয়েছেন এমন কয়েকজন নারীকে সেখানেই পাওয়া গেল। তাঁদের মধ্যে সাগরী হাসদা (৩০), রোজিনা মুর্মু (২৮), পার্বতী সরেন ও সালোনী হাসদা (৩৫) জানালেন আদরীর পরামর্শ নিয়ে তাঁরা বেশ সফলতা পেয়েছেন।

‘উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনুদাদার জন্যই ভাগ্য বদল হয়েছে।’ বললেন আদরী মার্ডি। আর এ কথা জানানোর পর অতনু সরকার বলেন, ‘কৃষি বিভাগের একজন মাঠকর্মীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।’

সন্তান না হওয়ার জন্য স্বামী কংগ্রেস তাঁর স্ত্রী আদরী মার্ডিকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাচ্ছিলেন। পরে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন শুধু আদরীর নয়, কংগ্রেসেরও সমস্যা ছিল। তাই তাঁদের সন্তান হয়নি। আদরী যখন এই কাহিনি বলছিলেন, তখন পাশে বসে কংগ্রেস টুডু মুখ টিপে হাসছিলেন। আদরী বলেন, দীর্ঘ আট বছর চিকিৎসার পর গত বছরের এপ্রিলে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। নাম রেখেছেন মিথিলা টুডু। সে ইতিমধ্যে কথা বলতে শিখছে। আদরীকে ডাকে ‘গগ’। সাঁওতালি ভাষায় ‘গগ’ মানে মা।

মন্তব্য পড়ুন 0