মুষ্টি চাল সঞ্চয় করে সফল লাবণী

বিজ্ঞাপন
default-image

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১৪ বছর বয়সী কিশোরী লাবণী আক্তারকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। স্বামীর সংসারে এক বেলা ভাত জুটত তো দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হতো। তবে সেই লাবণী এখন সফল উদ্যোক্তা। প্রতিদিন রান্নার চাল থেকে পাঁচ মুষ্টি চাল সঞ্চয় করা শুরু করেই তাঁর এ সফলতা এসেছে। এখন তাঁকে দেখেই অনেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।

নীলফামারীর মেয়ে লাবণী। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নে ২০০৯ সালে মশিয়ার রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বাবারও ছিল অভাবের সংসার।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লাবণী জানালেন, এক বছর পর জমানো মুষ্টি চাল আর গলার সোনার হার বিক্রি করে কেনেন ৪০টি হাঁস-মুরগি ও ছয়টি ছাগল। এরপর ছাগলের বাচ্চা ও হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে ২০১১ সালে কেনেন সংকর জাতের দুটি বকনা বাছুর। বছর দুয়েক পর গরু দুটি থেকে প্রতিদিন ৩০ লিটার করে দুধ পেতে শুরু করেন। দুধ বিক্রি করে দিনে প্রায় ৬০০ টাকা আয় হয়। গোবর দিয়ে জ্বালানি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেও কিছু টাকা পান। এভাবে তিন বছরে আরও চারটি সংকর জাতের গাভি কেনেন। ছয়টি গাভি দিয়ে শুরু করেন ডেইরি খামার। বর্তমানে লাবণীর খামারে দেশি-বিদেশি গাভি মিলে মোট গরু ২০টি। প্রতিদিন খামার থেকে গড়ে ১০০-১১০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। প্রতি লিটার দুধ ৪৫ টাকা করে বিক্রি করে খরচ বাদে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ টাকা লাভ থাকে। বছরে তিন লাখ টাকার বাছুরও বিক্রি করেন তিনি।

নিজের টাকায় লাবণী খড়ের ঘরের জায়গায় আধা পাকা টিনের বাড়ি করেছেন। কিনেছেন দেড় একর আবাদি জমি। গাভির খামারও করেছেন পাকা। বাড়ির চারদিকে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেঁপের গাছ ও শাকসবজি লাগিয়েছেন। আত্মনির্ভরশীল লাবণী এলাকাবাসী ও পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছেন শ্রদ্ধার মানুষ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিজের সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি লাবণী গ্রামের অন্যদের পরামর্শ দিয়ে গাভি পালনে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর দেখাদেখি অনেক নারী গাভি পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পশ্চিম ইকরচালী গ্রামের ফেনসি খাতুন, সুলতানা বেগম, লক্ষ্মীপুর গ্রামের মমিনা খাতুন, জোহরা বেগমসহ অনেকে চার-পাঁচ বছর ধরে গাভি পালন করে নিজের বাড়ি, আবাদি জমি করেছেন। হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গাভি পালন করে এখন সুখের সংসার তাঁদের।

কথা হয় পশ্চিম ইকরচালী গ্রামের খাদিজা খাতুনের সঙ্গে। তিন সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন। লাবণীর পরামর্শে গাভি পালন শুরু করেন। এখন তাঁর চারটি গাভি, পাঁচটি ছাগল ও হাঁস-মুরগি রয়েছে। ১৪ শতক জমিও কিনেছেন তিনি।

মাঝের হাট গ্রামের মাজেদা খাতুন জানান, তাঁর বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিন চলত তাঁর। এখন তাঁর গাভি পালনের আয়ের টাকায় স্বামী মাঝের হাটে গোখাদ্যের দোকান দিয়েছেন। কিনেছেন ২৫ শতক জমি, করেছেন টিনের বাড়ি, রয়েছে চারটি গাভি। স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে সুখের সংসার তাঁর।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইকরচালী ইউনিয়নের অনেক বেকার তরুণও লাবণীর দেখাদেখি গাভি পালন করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। পশ্চিম ইকরচালী গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম, সাদিকুল ইসলাম, মহুবার রহমান, রোকন ইসলাম, মোজা মিয়া, মণ্ডলপাড়া গ্রামের মিঠু মিয়ার এখন মাসিক আয় ২০-২৫ হাজার টাকা।

অভাবের কারণে লাবণী বেশি দূর পড়তে পারেননি। তাঁর স্বপ্ন এখন ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত ও যোগ্য করে গড়ে তোলা। ছয় বছরের মেয়ে মিশু আক্তার ও ১১ বছরের ছেলে আশিক বাবুকে স্কুলে পাঠান। খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন লাবণী।

ইকরচালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, লাবণী কষ্ট করে আজ এ জায়গায় এসেছেন। লাবণীকে দেখে ইউনিয়নের অনেক নারী-পুরুষ গাভি পালন করে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। গাভি পালনকে ঘিরে এখানে অনেক দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। গাভির পরিচর্যা, গাভির খাদ্য, ওষুধের ব্যবসা করে অনেকে জীবিকা চালাচ্ছেন।

উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ও ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাগরিকা কাজী জানান, তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে ইকরচালী ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি গাভি পালিত হয়। এ ইউনিয়নের উৎপাদিত দুধ গ্রামের লোকজনের চাহিদা মিটিয়েও দেশের বিভিন্ন অংশে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন