শুদ্ধ বিনোদনচর্চার অভাব রয়েছে

default-image

তানিয়া হক

অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বায়নের কারণে এখন সবকিছু হাতের মুঠোয়। জীবনযাপনে প্রযুক্তি বড় জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। এসবের ভিড়ে আমরা কোনটা গ্রহণ করব, কোনটা করব না—সেই মাপকাঠি তৈরি করতে পারিনি। যোগাযোগের এসব মাধ্যম ও প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকটি আমরা বেশি নিচ্ছি। আমাদের কতটুকু যাওয়া উচিত, কোথায় গেলে থামা উচিত, সে বোধ তৈরি হতে হবে।

আগে পাড়া সংস্কৃতি ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক চর্চা হতো। এখন সেটাও নেই। শুদ্ধ বিনোদনচর্চার বেশ ঘাটতি রয়েছে। এর পরিবর্তে ছোট ছোট বার তৈরির চল শুরু হয়েছে। বিনোদনের নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। শুদ্ধ বিনোদনের বিষয়টি আমরা হারিয়ে ফেলছি, যে বিনোদন মন বিকশিত হওয়ার জায়গা তৈরি করবে; মনকে জটিল-কুটিল-হিংসাত্মক করবে না।

ছেলেমেয়েদের স্বাধীনতার মানে বুঝতে হবে, নৈতিকতা শিখতে হবে। ছেলেমেয়েরা বিনোদনের জন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা পায় না। ভালো রেজাল্ট, ভালো চাকরির ভাবনা থেকে ছেলেমেয়েদের বের করে এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠক্রমবহির্ভূত কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানকে গুণগত সময় দিতে হবে। গুণগত সময় বলতে কী বোঝায়, সেটাও মা–বাবাকে আগে বুঝতে হবে। মা–বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কে যেন কোনো ফাঁক না থাকে। পারিবারিক বন্ধন তৈরি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

স্কুলের নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়িতেও হতে হবে

default-image

সাব্রিনা শহীদ

অধ্যক্ষ, স্যার জন উইলসন স্কুল, ঢাকা

স্কুলে শিশু থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠদানে আমরা স্বাস্থ্য ও নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিই। ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ, বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক পরিবর্তন বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া হয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেওয়া হয়, তার কতটুকু প্রাপ্য।

নিজের অধিকার সম্পর্কে না জানলে কার সঙ্গে মিশতে হবে, কী করতে হবে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা তৈরি হবে না। শিক্ষার্থীরা খুব ভালোভাবেই সেসব গ্রহণ করে। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন শ্রেণিকক্ষের বাইরের পরিবেশের সঙ্গে তাদের শিখে যাওয়া বিষয়গুলো মেলাতে না পারে।

অনেক বাড়িতে নৈতিক শিক্ষার চর্চা সেভাবে হয় না। আমরা ছেলেমেয়ের সামনে ‘হোয়াইট লাই’ (নির্দোষ মিথ্যা) বলে ফেলি। অনেক সময় তত সতর্কও থাকি না। সন্তানেরা সেসব মিথ্যার অর্থ বুঝতে পারে না। তাদের শেখার জগতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়।

অভিভাবকদের নিয়ে বেশ কিছু কর্মশালা করতে গিয়ে দেখেছি, মা-বাবা বলছেন সন্তান নিজের মতো করে থাকে, কথা বললেও চুপ করে থাকে। আবার সন্তানেরা বলছে, মা-বাবাকে সমস্যার কথা বললে অনেক সময় তাঁরা বুঝতে চান না, বিরক্ত হন। এ জন্য মা-বাবাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। প্রযুক্তির এই যুগে ছেলেমেয়েদের ঘরবন্দী করে রাখা সম্ভব নয়। তাই সন্তানের সঙ্গে খোলামনে কথা বলেই নজরদারি রাখতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলেই লাগামহীনভাবে মা-বাবাকে দোষারোপ করার ঘটনা বেদনাদায়ক। সবার মনে রাখা উচিত, কেউ নিজের সন্তানের অনিষ্ট চান না।

বোঝাতে হবে মা–বাবা বড় শুভাকাঙ্ক্ষী

default-image

রওনক জাহান

একজন অভিভাবক এবং আঞ্চলিক পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার

আমার মেয়ে রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শেষ পর্যায়ের শিক্ষার্থী। কলাবাগানের স্কুলপড়ুয়া মেয়েটি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবক হিসেবে আমার মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ কাজ করছে। অসংখ্যবার মনের কোণে উঁকি দেয় সন্তানের প্রতি আমার দায়িত্ব পালনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো।

অভিভাবক হিসেবে আমার মাথায় প্রথমেই যে ভাবনা আসে, সন্তান যেন মা–বাবার কাছে নিঃসংকোচে সবকিছু বলতে পারে। ছোটবেলা থেকে এই বোধ তৈরি করে দিতে হবে, ‘মা-বাবাই তোমার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। মা-বাবা শাসন করলে, বকাঝকা করলেও তা তোমার ক্ষতির কারণ হবে না।’ মা-বাবাই বড় আশ্রয়। বন্ধুরা তোমার বয়সী, তোমার মতোই তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা। আমরা অনেক সময় সন্তানের পেশাজীবন নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করে মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে সমঝোতা করে ফেলি। ফলে সন্তানেরাও অনেক সময় এই শিক্ষা নেয়, যেকোনো উপায়ে সফলতা পাওয়াই হলো মুখ্য বিষয়।

কিশোর অবস্থায় রোমাঞ্চ বেশি থাকে, জীবন সম্পর্কে ধারণা কম থাকে। ফলে ছোট্ট একটা ভুল যে অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেটা ছেলেমেয়েরা বুঝে উঠতে পারে না। সন্তানকে বোঝাতে হবে, মা-বাবাকে ফাঁকি দেওয়া মানে নিজেকে ফাঁকি দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

আগে পরিণতি ভাবতে হবে

default-image

মেখলা সরকার

সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

উঠতি বয়সী তরুণ–তরুণীদের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর পরিণতি নিয়ে ভাবতে হবে। হুটহাট সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজেকে সময় দিতে হবে। অপরিচিত কারও কাছে যাওয়া, সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে ছেলেরাও বিপদে পড়ে যেতে পারে। তবে শারীরিক সম্পর্ক, প্রেম–বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের বেশি সতর্ক হতে হবে। কারণ, এসব ক্ষেত্রে পরিণতি মেয়েদের এককভাবে বেশি ভোগ করতে হয়। অভিভাবকদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।

কিশোর–কিশোরীদের জীবনযাপন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর। ভার্চ্যুয়াল জগৎকে তারা বাস্তব মনে করে। জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা ক্ষীণ। ভার্চ্যুয়াল জগতের সঙ্গে বাস্তব জীবনের যে ফারাক, সেটা তারা বুঝে উঠতে পারে না। এটা না বোঝার কারণে তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। সবাই সচেতন না হলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

সন্তানের বয়স অনুযায়ী তাদের করণীয় নির্ধারণ করে দিতে হবে অভিভাবকদের। নর–নারীর সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক–নেতিবাচক আলোচনা করতে হবে সন্তানের সঙ্গে। ‘তুমি এটা করতে পারবে না’ বলার চেয়ে ‘এটা করলে তা তোমার জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে’, সেটি বুঝিয়ে বলতে হবে। সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কে বিশ্বাসের ভিত যেন থাকে। কোনো বিপদে পড়লে সন্তান যেন খোলামনে মা-বাবার কাছে বলতে পারে। সন্তানের ভুলের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করলে সন্তান কোনো ভুল করলে মা-বাবাকে আর বলতে চাইবে না।

গোপন নজরদারি নয়, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, তা তত্ত্বাবধানের মধ্যে রাখতে হবে। সন্তানের বন্ধুদের দাওয়াত দিতে হবে এবং বন্ধুদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।

অভিযোগ পাওয়ামাত্র পুলিশ ব্যবস্থা নেয়

default-image

রুমানা আক্তার

বিশেষ সুপার, ফরেনসিক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)

কোনো মেয়ে বিপদে পড়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাবেন। অনেক সময় কাছের ব্যক্তিদের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে মেয়েরা বুঝে উঠতে পারেন না কী করতে হবে। বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে পুলিশ সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেয়। কমিউনিটি পুলিশ এলাকায় এলাকায় বিভিন্ন প্রচার চালিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সব জায়গায় পুলিশের উপস্থিতি সম্ভব নয়। ঘরে ঘরে নিরাপত্তা দেওয়াও সম্ভব নয়।

অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তৎপরতার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারি। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। মা-বাবাই সবার আগে বুঝতে পারেন ছেলেমেয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। পরিবার থেকেই কৈশোরের ভিত গড়ে ওঠে। জীবনে চলার পথে প্রাথমিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা আমরা পরিবার থেকেই পাই। এ অপরাধগুলোর সঙ্গে যারা জড়িত, গণমাধ্যমের উচিত সেসব পরিবারের মধ্যে বন্ধন কেমন, তা খোঁজ করে দেখা। সমাজ ও স্কুলেরও এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা রয়েছে।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন