রংতুলির ছোপছাপ

১৮ নারী শিল্পীর দেয়ালচিত্রে নারীর অধিকার

৭২ ফুট লম্বা আর ১০ ফুট উচ্চতার একটি দেয়াল। সেই দেয়াল হয়ে উঠেছে শিল্পীর ক্যানভাস। রংতুলিতে আঁকছেন ২০ জন নারী শিল্পী। পথচারীদের কাছে অনেকটা অচেনা এই দৃশ্য। তাই তো রিকশা, গাড়ির যাত্রী বা পথচারীদের নজর আটকে যাচ্ছে এই দেয়ালচিত্রে।

গতকাল ৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই বিশেষ দিন পালন করতে ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্যালয়ের পাশের দেয়ালে হয়েছে ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম। ‘রাইট টু সিটি’ নামে এই দেয়ালচিত্রে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন নারী ও তার অধিকারের নানান রূপ। ৬ মার্চ শিল্পীরা দেয়ারে এঁকেছেন তাঁদের ছবি।

দিনব্যাপী এ আয়োজনে চিত্রশিল্পী ফারেহা জেবার নেতৃত্বে দেয়ালচিত্র এঁকেছেন ১৮ জন তরুণ নারী শিল্পী। এতে অংশ নিয়েছেন চিত্রশিল্পী কনক চাঁপা চাকমা। তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি দেয়ালচিত্র তৈরিতে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ তাঁদের অধিকারের কথাই জানান দিচ্ছে। একটি শহরে একজন নারীর অধিকারের বিষয় প্রতিফলিত হয়েছে এই ছবিতে।’

প্রকৃতিকে নারীর রূপ দিয়ে ছবির মাধ্যমে দেয়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দিবারা মাহবুব। নারীর অধিকার রয়েছে সবখানে, এই চিন্তাকেই তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর দেয়ালচিত্রে। শিল্পী আতিয়া মাইবাম তাঁর চিত্রকর্মে নারীর নিজস্বতাকেই এঁকেছেন। মণিপুরি সংস্কৃতি ও মণিপুরি নারীদের পোশাক ফানেকের নকশা তিনি এঁকেছেন দেয়ালে।

তরুণ ১৮ শিল্পীর আঁকা ভিন্ন ভিন্ন ছবিকে একটি অভিন্ন রূপ দেন শিল্পী ফারেহা জেবা। তিনি বলেন, দেয়ালচিত্রে নারীর অধিকার তুলে ধরতে খুব ইতিবাচক চিন্তা ও উজ্জ্বল সব রং প্রাধান্য পেয়েছে। নারীর কষ্ট নয়, বরং আনন্দ আঁকা হয়েছে এখানে। ১৮ শিল্পী ভিন্নভাবে ছবি আঁকলেও এটি মূলত সব মিলিয়ে একটি দেয়ালচিত্র।

এই দেয়ালচিত্র এঁকেছেন শিল্পী নুজহাত তাবাসসুম, কাজী ইস্তেলা আহমেদ, ইসমত আরা, মাহমুদা আকতার, সুরভী আক্তার, মানসী বণিক, সারিয়া আহমেদ, সাইকা চৌধুরী, দিবারা মাহমুদ, নিপা নিপবীথি দাশ, লায়লা ফজল, পাপিয়া সারোয়ার, মন্দ্রিলা মধুরিমা, ইশতেলা ইমাম, আতিয়া মাইবাম, অাঁখি নূর বিনতে আলী, আলভী চাকমা, রূপশ্রী হাজং।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই চিত্রকর্মটির উদ্বোধন করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসে টেরিঙ্গ ।

বিজ্ঞাপন

সহপাঠী ১১ শিল্পীর কালারস

default-image

তাঁরা ১১ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জড়িয়েছেন নানা পেশায়—কেউ চাকরি, কেউ ব্যবসা, কেউবা সামলাচ্ছেন স্রেফ ঘর। কিন্তু রংতুলির সঙ্গে যে সখ্য গড়ে উঠেছিল, সেই সত্তাকে ধারণ করছেন মনেপ্রাণে। তাই তো জীবনের গতিতে রংতুলি ধরায় বেশ কয়েক বছরের ছেদ পড়লেও আবার ফিরে আসেন আপন আঙিনায়। ১১ বন্ধু মিলে শুরু করেন শিল্পচর্চা। উদ্যোগী হয়ে নিজেদের দল বানিয়েছেন। নাম দিয়েছেন কালারস।

কালারসের নামে ছয় বছর থেকে আয়োজন করা হচ্ছে প্রদর্শনীর। করোনা সংক্রমণের কারণে গত বছর আয়োজনটি বন্ধ থাকলেও এবার ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ দিন ধরে চলেছে প্রদর্শনী। মোহাম্মদপুরের স্টুডিও ৬/৬ সেজেছিল তাঁদের ৩৭টি শিল্পকর্মে। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘একুশের চেতনায়’।

প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিল্পী ফারজানা আফরোজ জানালেন, ১৬ বছর ছবি আঁকার আনন্দ থেকে দূরে ছিলেন তিনি। এই সময়ে কাপড় নকশা আর ব্যবসা করেছেন। কিন্তু শিল্পী মনকে আর আটকাতে পারেননি। তাই ১৬ বছরের ব্যবসা ছেড়ে তিনি এখন সঙ্গী করলেন রংতুলিকে। তিনি বলেন, রংতুলি থেকে ফুটিয়ে তোলা চিত্রে থাকতে পারে একজন নারীর জীবনের অনেক গল্প, আনন্দ বা সংগ্রাম। নিজের সব অনুভূতিকে তুলে ধরা সব থেকে সহজ মাধ্যম হলো চিত্রকলা।

প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিল্পীদের একজন মনিদীপা দাশগুপ্ত। তিনিও চিত্রকর্মের সঙ্গে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন ১৬ বছর পর। সেটাও কালারস সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। তিনি বলেন, ‘ছবি আঁকার জন্য অনুপ্রেরণা খুব বেশি দরকার। আমি সেটি পেয়েছি এই বন্ধুদের কাছে।’ ২০১৫ সাল থেকে এখনো নিজেকে শৈল্পিক কাজের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন মনিদীপা।

শৈল্পিক কর্মের প্রতি ভালোবাসার জন্য চাকরি ছেড়েছেন দলটির আরেক শিল্পী রিফাত জাহান। তিনি শিক্ষকতা করতেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যখন অনুভব করলেন শিল্পকর্মই তাঁকে আত্মিক আনন্দ দেয়, তখন চাকরি ছাড়তে দ্বিতীয়বার চিন্তা করেননি। এখন রংতুলিতেই খোঁজেন আনন্দ।

কালারসের উদ্যোক্তাদের ভিন্ন ভিন্ন গল্প থাকলেও শিল্পচর্চা বা ছবি আঁকা যে তাঁদের মানসিক প্রশান্তি, তাতে একমত ১১ বন্ধু। তাঁরা বললেন, শুধু নিজেদের একক প্রচেষ্টায় নয়, বরং সঙ্গী আর পরিবারের কাছ থেকেও এত বছর ধরে পাচ্ছেন সহযোগিতা। অনেকেই আবার বললেন, নারীর সংগ্রাম নিজের সঙ্গে নিজের। চিত্রকর্মের পাশাপাশি সংসারের অনেক দায়িত্ব তাঁরা নিজ তাগিদেই করে থাকেন।

তাঁদের কথা শুনে মনে হলো, একজন নারীর জীবনসংগ্রাম কখনো হয়তো শেষ হওয়ার নয়—কখনো সংসার, কখনো চাকরি আবার কখনো ভিন্ন ধরনের ব্যস্ততার বেড়াজালে বন্দী থাকতে হয় একজন নারীকে। কিন্তু ছকে বাঁধা নিয়মের বাইরেও রয়েছে তাঁর নিজস্ব পছন্দ, নিজস্ব সত্তা। ১১ শিল্পী যেন তাঁদের এই নিজস্ব ভালোলাগা আর সত্তার সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছেন।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন