default-image

আরজুমণির ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক হবেন। কিন্তু দারিদ্র্য, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ আর বাল্যবিবাহের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। ছাড়তে হয়েছে তাঁর গ্রাম। চিকিৎসক হতে না পারলেও এখন নার্স হওয়ার জন্য চট্টগ্রামের একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আরজু।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ভোলার চরফ্যাশন সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আরজুমণি কয়েকবার তোপের মুখে পড়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় লেবাসধারী নেতা-সমাজপতির নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। ফেসবুক লাইভে বাজে মন্তব্য আরজুকে শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলেও বন্ধ হয়ে যায় কিশোরী ক্লাবটি। নিরাপত্তাহীনতায় চট্টগ্রামে ভাইয়ের কাছে চলে যেতে বাধ্য হন আরজু।

আরজু বেগমকে সবাই ডাকেন আরজুমণি নামে। বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার জিন্নাগড় ইউনিয়নের দক্ষিণ ফ্যাশন গ্রামে। তাঁর বাবা মো. জাহাঙ্গীর ফরাজী পেশায় রাজমিস্ত্রি। বড় তিন ভাই কর্মজীবী। ভাইবোনদের মধ্যে আরজুমণি সবার ছোট। মা বিবি ফাতেমা বেগম গৃহিণী।

বিজ্ঞাপন

চরফ্যাশন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা–বাবা গোপনে ভোলার লালমোহন উপজেলার এক পোশাককর্মীর সঙ্গে আরজুকে বিয়ে দেন। আরজুমণি এ বিয়ে মেনে নেননি। খবরটি শোনার পরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ঘুরে দাঁড়ান। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতায় শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পরিবর্তে তালাকনামা পাঠান। এ সিদ্ধান্তে পারিবারিক বাধা আসে। সেই বাধা উপেক্ষা করে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

আরজুমণি বলেন, ‘একটি মেয়ের মতামত ছাড়া কীভাবে বিয়ে হতে পারে!’ কয়েক দিন ঘুম আসে না তাঁর। শিক্ষকদের সহায়তায় তালাকনামা পাঠানোর পর তিনি পূর্ণোদ্যোমে পড়ালেখা করে এসএসসি পাস করেন। ফলাফল ছিল জিপিএ-৪.৫৬। পরে চরফ্যাশন সরকারি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। কলেজে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। শুরু করেন স্কাউটিং। পরিবেশ আন্দোলন, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নেন আরজু। তিনি বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ট্রাস্ট পরিচালিত কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সদস্য হন। তিনি নিজ গ্রাম ও জিন্নাগড় ইউনিয়নের কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছেন। এসবের মধ্যেই শুরু হয় করোনার প্রকোপ। কলেজ হয়ে যায় বন্ধ। সংস্থার অন্য সদস্যদের সঙ্গে মানুষদের সচেতনতায় মাস্ক ও লিফলেট বিতরণ করে। আরজু ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। দিনে দিনে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে, কিন্তু পরীক্ষা হয় না।

default-image

আরজু জানান, বাড়িতে পড়াশোনার পাশাপাশি গত দুই মাস আগে তাঁদের নিজ বাড়িতেই (মকবুল রাজের বাড়ি) কোস্ট ট্রাস্টের সহযোগিতায় এলাকার অসচেতন সমাজের কিশোরীদের সচেতন করতে ‘রোজ কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ নামের একটি সংগঠন চালু করেন। সেখানে ২০ কিশোরী, ১০ কিশোরসহ ৩০ জন সদস্য। ক্লাবে বাল্যবিবাহ বন্ধ, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়ন, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, নিরাপদ ইন্টারনেট–সেবা, সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের সাহায্য-সহযোগিতা, বই পড়াসহ নানা রকম সামাজিক সমস্যা সমাধানে সচেতন করে আসছিলেন।

গত ১৪ নভেম্বর ক্লাব মিলনায়তনে কিশোর-কিশোরীদের সচেতনতামূলক সংলাপ অনুষ্ঠান ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন জিন্নাগড় ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাকের কুতুব। ১৫ নভেম্বর কিছু লোকজনের নেতৃত্বে আরজুমণির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন এলাকাবাসী। তাঁরা কিশোর-কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচার চালান, কিশোর-কিশোরীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্লাবে না আসার জন্য তাদের মা-বাবাদের চাপ দেন। আরজুমণির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, অপপ্রচার করেও তাঁরা ক্ষান্ত হননি। ফেসবুক লাইভে এসে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ করার হুমকি দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আরজুমণি ও তাঁর পরিবার শঙ্কার মধ্যে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

আরজু বলেন, ক্লাবটি বাল্যবিবাহপ্রবণ এই এলাকার অনেকের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়স্বজনও জড়িত। তাঁরা উসকানি দিয়ে গ্রামবাসীদের মাধ্যমে এসব কাজ করিয়েছেন। ফেসবুকে তাঁকে কটাক্ষ করে নানা অশালীন মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে।

বাধ্য হয়ে তাঁর মা–বাবা তাঁকে চট্টগ্রামে ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। যদি গত বছর এইচএসসি পরীক্ষা হতো, তবে পরীক্ষায় বসতে আরজুর সমস্যা হতো। আরজু মনে করেন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বংশের মধ্যে তাঁর শিক্ষিত হয়ে ওঠা, পারিবারিক বিরোধ, অসচেতন-অশিক্ষিত পরিবেশই তাঁর চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউএনওর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও ভবিষ্যতে ইস্যু তুলে বিরুদ্ধাচারণ করতে পারেন বিক্ষোভকারীরা। তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আরজুমণি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাঁর অনেক ইচ্ছা ছিল জীবনে চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু পারিবারিক অসচ্ছলতা, নানা রকম বাধা তাঁকে ভালো ফলাফল করতে দেয়নি। তাই তিনি ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চট্টগ্রামের নার্সিং ইনস্টিটিউটে।

কোস্ট ট্রাস্টের দলীয় প্রধান রাশিদা বেগম জানান, ইউনিসেফ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কোস্ট ট্রাস্ট শিশু সুরক্ষা ত্বরান্বিতকরণ কর্মসূচির (এপিসি) অধীনে ভোলা জেলার ৪টি উপজেলায় ৪০টি ইউনিয়নে কাজ করছে। সেখানে ১২০টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব গঠন করা হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলায় ১৯টি ইউনিয়নে ৫৭টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব আছে। আরজুমণি একটি ক্লাবের দলীয়প্রধান ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আরজুর ওপর যে অন্যায় আচরণ সংগঠিত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারীদের আমরা জানাই। আরজুমণি ও তার পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ার জন্য উৎসাহও দিয়েছি।’

আরজুমণির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পরপরই তাৎক্ষণিক কোস্ট ট্রাস্টকে থানায় মামলা করতে বলেছিলেন চরফ্যাশনের ইউএনও মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে মসজিদের ইমাম সাহেবকে তাঁর ফেসবুকের ভিডিও মুছে ফেলতেও বলি। কারণ, আরজুমণি যে কাজ করছে, তা সরকারেরই কাজ।’

মন্তব্য করুন