বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ধারণা করা হচ্ছে, ট্রেনের কামরায় বসে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে বেগমগঞ্জ পর্যন্ত জলিকে কয়েক দফায় গোপনে চোখ মুছতে হয়েছে। কাজটি সবার সামনে করার সুবিধাটুকুও বরাদ্দ হয়নি তাঁর জন্য। কেননা, এর সঙ্গে শ্বশুরকুলের মানসম্মান জড়িত। আর কিছুই বলতে না পেরে কর্মস্থলে ফেরার সময় সিএনজির অন্ধকারে নিজের অসহায়ত্বে দগ্ধ হয়েছেন অন্যজন। ভিন্ন অবস্থানে থাকা দুই নারী সেদিন অভিন্ন মানসিক অবস্থাতেই ছিলেন উত্তরার ওই বসার ঘরে। মানসিক এ পরিস্থিতিকে নির্যাতন বলা যায় কি না, সে সিদ্ধান্ত পাঠকের। তবে এসব টুকরা ঘটনাতেই থাকে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। অন্তত সর্বশেষ ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাকাণ্ডও তা–ই বলে। ১৪ ডিসেম্বর বনানীতে নিহত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এলমা চৌধুরীর মানসিকভাবে নির্যাতিত হওয়ার বহু ইতিহাস ছিল। নৃত্যকলা বিভাগের এ ছাত্রীকে বিভিন্ন পর্যায়ে নাজেহালের কথা জানিয়েছে তাঁর পরিবার। এলমার বাবা বলছিলেন, চলে আসার কথা বললে মেয়ে জানিয়েছিলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। এসব ঠিক হয়ে যাওয়ার আশাটা ভুল কিছু নয়। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তনের আভাস না থাকলে এ কালক্ষেপণই একদিন চূড়ান্ত পরিণতি ঘটায়। সে যন্ত্রণায় নারীর কোনো শ্রেণিভেদ হয় না। শিক্ষিত হলে নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে না, ধারণাটি ভুল। ২০১১ সালের জুনে স্বামীর হামলায় দৃষ্টিশক্তি হারানো শিক্ষক রুমানা মনজুরের ঘটনা নিশ্চয়ই মনে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক রুমানা মনজুরের সেদিনের পরিণতি এক দিনে ঘটেনি। ১০ বছর ধরে তিনি স্বামীর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা মেনে নিচ্ছিলেন।

default-image

নৃত্যকলা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এলমা চৌধুরীও ভাবছিলেন, কানাডাপ্রবাসী স্বামী হয়তো নিজেকে শুধরে নেবেন। এই নারীরা শিক্ষিত। কেউ প্রতিষ্ঠিত, কেউ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলছিলেন, আর্থিক অবস্থার তারতম্যের সঙ্গে নির্যাতনে পার্থক্য হতে পারে। তবে নারী নির্যাতনের ঘটনা সব রকম অবস্থাসম্পন্ন পরিবারেই ঘটতে পারে এবং ঘটে থাকে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের কাছ থেকেও নারী নির্যাতনের অভিযোগ আসে তাঁদের কাছে। তবে এসব ক্ষেত্রে সরাসরি শারীরিক আঘাতের চেয়ে বেশি থাকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ। মানসিক নির্যাতন যে আমলেই নেওয়া হয় না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি একে নির্যাতনের তালিকাতে স্থান দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও বচসা কম নেই। এর আরেকটি কারণ সম্ভবত আইনগতভাবে কম শাস্তির বিধান। মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০–এর আওতায় অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলেও এর শাস্তি কঠোর নয়। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ যেমন আমলযোগ্য, তেমনি জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য। বাংলাদেশে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে, বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। নারীরা যেমন মানসিক, শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন, একই সঙ্গে নির্যাতনের সুযোগও কখনো কখনো তিনি নিজের অজান্তেই তৈরি করেন। সে ঘটনা সাধারণত কিশোরীদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে। কিশোর–কিশোরীদের কৈশোরের সব সিদ্ধান্তের দায়ভার তার একার নয়। পরিবারের দায়িত্বশীল হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তেমনি নারী নির্যাতনের প্রসঙ্গেও পরিবারের মানসিক অবস্থাই সবচেয়ে জরুরি। কেননা, মানসিক আঘাতের দাগটা দেখানো যায় না। কিন্তু একটু একটু করে সে আঘাতই তৈরি করে হত্যা বা আত্মহত্যার পটভূমি।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন