বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বর্ণালি ও লেখা দত্ত পড়ে গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের গুয়াখোলা গ্রামে ওই বিদ্যালয়। উপজেলা সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার সীমান্তে স্কুলটির অবস্থান। বাঘারপাড়া উপজেলার কমলাপুর, রঘুরামপুর, দোগাছি, ঘোড়ানাছ, বাকড়ী ও কিসমতবাকড়ী গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়াশোনা করে। এ ছাড়া নড়াইল সদর উপজেলার গুয়াখোলা, হাতিয়াড়া, বাকলি, মালিয়াট ও বেনাহাটী গ্রামের শিশুরা এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

বাঘারপাড়া উপজেলার কমলাপুর গ্রামের সমাপ্তি গুপ্ত ও বৈশাখী গুপ্ত ওই বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বিদ্যালয় থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে তাদের গ্রাম। স্কুল থেকে কিনে দেওয়া বাইসাইকেলে করে যাতায়াত করে তারা। তাদের মা-বাবাও অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের দুজনের মা কনিকা গুপ্ত ও রুপা গুপ্ত বলছিলেন, বাইসাইকেল কিনে দেওয়ারও সামর্থ্য তাঁদের নেই। স্কুল থেকে সাইকেল কিনে না দিলে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো, তাতে হয়তো পড়ালেখাই হতো না।

default-image

১৯৮৩ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় প্রত্যন্ত ওই গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ রাস্তাই ছিল কাঁচা। আশপাশ থেকে অল্প কিছু ছেলেমেয়ে এ স্কুলে পড়তে আসত। আস্তে আস্তে শিক্ষার্থী বাড়তে থাকে। দূর থেকেও ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা। ২০০৮ সালের দিকে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও কয়েকটি বাইসাইকেল কেনে। বাইসাইকেলে মেয়েরা স্কুলে আসতে থাকে। গ্রামের রাস্তায় মেয়েদের বাইসাইকেল চালানো দেখে সমালোচনা হতো। রাস্তার পাশ থেকে ছেলেরা টিপ্পনী কাটত, বলত আজেবাজে কথা। কিন্তু শিক্ষকেরা উৎসাহ দিতেন, অভিভাবকদের বোঝাতেন। শিক্ষকেরা গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ছাত্রীদের বাইসাইকেলে যাতায়াতে নিরাপত্তা দিতেন। এভাবে বাড়তে থাকে ছাত্রীদের বাইসাইকেলের সংখ্যা। ২০১২ সালে স্কুলের ফল ভালো হয় আশপাশের স্কুলের চেয়ে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চোখ পড়ে স্কুলটির প্রতি। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থী। বাইসাইকেলে যাতায়াতেরও পরিমাণও বাড়ে।

শিক্ষক শিখা রানী মল্লিক, তাপস পাঠক, শিবানী রানী দাস, শেফালীবালা ভৌমিক, সুকান্ত গোস্বামী ও কৃষ্ণগোপাল রায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁরা জানান, বিদ্যালয়ে এখন ১৭২ জন ছাত্রী, ছাত্র ১৭৬ জন। এরা সবাই এখন বাইসাইকেলে যাতায়াত করে। এলাকাবাসী এখন এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অভিভাবক ও এলাকার সুধীজন এতে উৎসাহ দিচ্ছেন। উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন থেকে অনেক দরিদ্র ছেলেমেয়েকে সাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের পাশাপাশি দরিদ্র ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে সাইকেল দেওয়া হয়। চালানো শেখান অভিভাবকেরা ও স্কুলের শিক্ষকেরা।

default-image

শিক্ষকেরা বলছিলেন, স্কুলের ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ভালো হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। দারিদ্র্যের কারণে স্কুল থেকে বেতনও নেওয়া যায় না। কৃষিনির্ভর এ এলাকার নারী-পুরুষ খেতখামারে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। সাইকেল দিয়ে উৎসাহ না দিলে এসব শিশুর হয়তো পড়াশোনাই হতো না। কারণ, দূর থেকে তারা হেঁটে নিয়মিত স্কুলে আসত না। পরিবহন হিসেবে আছে ভ্যান, তা–ও সময়মতো পাওয়া যায় না। আবার অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে যাতায়াত খরচ বহনও সম্ভব নয়।

এলাকার লোকজন বলছিলেন, স্কুল ছুটি হলে প্রায় সাড়ে তিন শ ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে বাইসাইকেলে স্কুল থেকে বের হয়। এ সময় গ্রামের রাস্তার চেহারাই হয় অন্য রকম। অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীরা দাঁড়িয়ে যায়, তাদের যাতায়াতে সহায়তা করে। একসঙ্গে বাইসাইকেলে যাতায়াত করায় মেয়েদের ঝুঁকিও কমে গেছে।

প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের ফলাফলও বিস্ময়কর। গত বছর ৩৫ শিক্ষার্থীর সবাই এসএসসি পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ জন। আগের বছর ৪৬ জনই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পায় ১২ জন। ২০১১ সাল থেকে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী এসএসসি ও জেএসসি পাস করছে। ফলও ভালো, এগিয়ে মেয়েরা।

সহশিক্ষা কার্যক্রমে জেলার মধ্যে এগিয়ে এই বিদ্যালয়। প্রতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ১৭ এপ্রিল বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, ঘটা করে উদ্‌যাপিত হচ্ছে মুজিবনগর দিবস। ১৪ এপ্রিল বাইসাইকেল শোভাযাত্রায় এলাকার ১১টি গ্রামের মানুষকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সাড়া ফেলেছে বিদ্যালয়টি। এ বিদ্যালয়ে আছে মেয়েদের ভলিবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতারু, অ্যাথলেটিকস ও সাইক্লিং দল। এ ছাড়া সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বক্তৃতা, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, কুইজ ও রচনা প্রতিযোগিতায় জেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে বিদ্যালয়টি।

গত ৭ মার্চ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। এতে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছে এ বিদ্যালয়ের মেয়েরা। গত শীতকালীন জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ভলিবলে এ বিদ্যালয়ের মেয়েরা জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ওই প্রতিযোগিতায় সাইক্লিংয়ে জাতীয় পর্যায়ে রানারআপ হয়েছে এ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী কোয়েল সেন এবং ব্যাডমিন্টনে একক ও দ্বৈত বিভাগে জেলাপর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ছাত্রী অঙ্কিতা ভৌমিক ও হ্যাপি পাঠক।

default-image

আগে বিদ্যালয়ে ছিল একটি একতলা ভবন। শিক্ষকেরা টাকা দিয়ে সেটিতে দোতলা করেছেন। নতুন চারতলা ভবন নির্মাণাধীন। তবে আছে বেশ কিছু সমস্যা। এত বাইসাইকেল রাখার কোনো গ্যারেজ নেই। রোদে ও বৃষ্টিতে খোলা মাঠেই থাকে সব সাইকেল। বিদ্যালয়ের খরচে লম্বা বড় একটি সাইকেল গ্যারেজ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, কিছুটা দেয়াল তোলা হয়েছে। কিন্তু টাকার অভাবে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যালয় চত্বরটি নিচু, বর্ষায় চত্বর পানিতে ডুবে যায়। মাটি ভরাট প্রয়োজন। টাকার অভাবে বিদ্যালয়ে করা হয়নি প্রাচীর ও শহীদ মিনার, জানালেন প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন