পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের প্রচারণায় মডেল হয়েছেন মৌসুমী মৌ
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের প্রচারণায় মডেল হয়েছেন মৌসুমী মৌসংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী তাঁর ছবি ও ভিডিও প্রেমিককে দেন বেশ আগে। জানতেও পারেননি সে ছবি ও ভিডিও তাঁর প্রেমিক শেয়ার করেছেন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। একদিন সম্পর্ক চুকেবুকে যায়। এরপর হঠাৎ একদিন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েটি আবিষ্কার করেন বিদেশি এক সাইটে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর সেই ছবি ও ভিডিও।

এই তরুণী সম্প্রতি পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের সহযোগিতা নিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ ১৬ নভেম্বর এই সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) মো. সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সেবা চালুর এক সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯১৬ জন যোগাযোগ করেছেন। সেবাপ্রার্থীদের সিংহভাগ কিশোরী ও তরুণী। বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের কোঠায়। তবে এর চেয়ে কম ও বেশি বয়সী নারীরাও সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। এদের একজনের বয়স ১৩, অন্যজনের ৬২ বছর। কিশোরীর ফেসবুক আইডি থেকে ছবি নিয়ে সম্পাদনা করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর ষাটোর্ধ্ব নারীর পক্ষ থেকে তাঁর ছেলে যোগাযোগ করেন পুলিশের সঙ্গে। তিনি জানান, ইমোতে (ইন্টারনেটভিত্তিক ফোন করার অ্যাপ) কল করে তাঁর মাকে বিরক্ত করা হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

যাতে নারীরা সহজে অভিযোগ করতে পারেন

ঠিক কোন ভাবনা থেকে এই সেবা চালু করেছে পুলিশ? রাজারবাগে পুলিশ টেলিকম মিলনায়তনে এই সেবার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ তাঁর ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং টেলিকমিউনিকেশন অ্যাক্টে ৬ হাজার ৯৯টি মামলা হয়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে ভুক্তভোগীদের সিংহভাগই নারী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাঁদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে অভিযোগ করেন না। তাঁরা যাতে নির্দ্বিধায় অভিযোগ করতে পারেন, সে জন্য একটা অল-উইমেন ইউনিট করেছি আমরা।’

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাঁরা জড়িত রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল প্রথম আলো। তবে ভুক্তভোগী নারীদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই ইউনিটের কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন না। পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ প্রশ্নের জবাব দিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে।

default-image

যে ধরনের অভিযোগ বেশি

কী ধরনের অভিযোগ নিয়ে নারীরা যোগাযোগ করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঘটনার শিকার একজন নারীর কাছে খুদে বার্তায় একটা লিঙ্ক (ওয়েব ঠিকানা) আসে। ওই লিঙ্কে ক্লিক করতেই তাঁর আইডি হ্যাকড হয়ে যায়। অপর এক নারী দুই সন্তানের মা। বয়সে ছোট ও দূর সম্পর্কের আত্মীয় নিয়মিত ফেসবুকের মেসেঞ্জারে যৌন হয়রানিমূলক খুদে বার্তা পাঠান। প্রায়ই তাঁকে পর্নোগ্রাফিক নানা কিছু পাঠান এবং যৌন সম্পর্ক স্থাপনে জোরাজুরি করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ওই আত্মীয় ভুক্তভোগী নারীকে ধর্ষণ ও তাঁর স্বামীকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেন।

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামেও হয়রানি কম নয়। ছবি সম্পাদনা করে অশ্লীল ছবির সঙ্গে যুক্ত করে অপরাধীরা। নকল (ফেক) আইডি খোলার অভিযোগ এসেছে পুলিশের কাছে। কখনো আবার শুধু ব্যক্তি নারী ঘটনার শিকার হয়েছেন, তা–ই নয়। বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের পুরো দল আক্রমণের শিকার হন। স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের একটি গ্রুপে প্রথমে একজনের আইডি হ্যাকড হয়েছিল, সেই আইডি থেকে অপরাধীরা পরে অন্যদের আইডির দখল নেয়। হ্যাকড হয়ে যাওয়া আইডি থেকে একের পর এক আপত্তিকর ছবি প্রকাশ হতে থাকে। এই দলের দুজন পরে আইডি ফিরে পেতে টাকাও দেন। তবে ভুক্তভোগীদের একজন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

বিজ্ঞাপন
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং টেলিকমিউনিকেশন অ্যাক্টে ৬ হাজার ৯৯টি মামলা হয়। পর্যালোচনায় দেখা গেছে ভুক্তভোগীদের সিংহভাগই নারী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাঁদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে অভিযোগ করেন না। তাঁরা যাতে নির্দ্বিধায় অভিযোগ করতে পারেন, সে জন্য একটা অল-উইমেন ইউনিট করেছি আমরা।
বেনজীর আহমেদ, মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ

যেভাবে সহায়তা করা হচ্ছে

মোটা দাগে নকল বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, আইডি হ্যাক করে হয়রানি বা টাকা দাবি করা, মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে হয়রানি ও হুমকি, ইমো, ইনস্টাগ্রাম বা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে হয়রানি এবং অপ্রয়োজনীয় খুদে বার্তা পাঠানোর অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে এখন পর্যন্ত ৪৮৯ জনকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পেরেছে পুলিশ। প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে ২৫১ জনের কাছ থেকে। বাকি ১১৭৬ জনের অভিযোগ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনেক সেবাপ্রত্যাশীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান যথাযথ না থাকায় বিপদ হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ প্রয়োজনীয় বার্তা দিয়েও নারীদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হলে করণীয়, ছবি ও নাম ব্যবহার করে তৈরি নকল আইডি, ইনস্টাগ্রাম আইডি, মেসেঞ্জার, ইনবক্স বা মেসেঞ্জারে কোনো অশ্লীল কনটেন্ট বা পর্নোগ্রাফি পাঠালে, ইনস্টাগ্রামে অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তা, পোস্ট, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি রিপোর্ট করা, আইডি রিমেম্বারিং (ব্যবহারকারী মারা গেলে) হলে করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে ভুক্তভোগীদের জানানো হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী নিজেই সমস্যার সমাধান করেছেন বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

যেভাবে অভিযোগ জানানো যাবে

Police Cyber Support for Women- PCSW নামে ফেসবুক পেজে মেসেজ দিয়ে অভিযোগ জানাতে হবে। এ ছাড়া cybersupport.women@police.gov.bd ঠিকানায় ই–মেইল করে অভিযোগ জানানো যাবে।

হটলাইন নম্বর ৯৯৯ এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ করা যাবে।

মন্তব্য করুন