default-image

টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারতের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির দেশগুলোর তারকা নারী ক্রিকেটারদের ভিড় কম ছিল না। উইমেনস টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের দুই ক্রিকেটার সালমা খাতুন ও জাহানারার প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল এই তারকাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। কাজটা বেশি কঠিন ছিল সালমার জন্য। জাহানারা এর আগেও এই টুর্নামেন্টে খেললেও সালমা যে গিয়েছিলেন এবারই প্রথম!

কিন্তু সালমার ভাগ্য ভালো। মরুর দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে মেয়েদের আইপিএল খেলতে গিয়েও তিনি পেয়েছেন চেনা আবহ। দলে ছিলেন কলকাতার তিন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী, রিচা ঘোষ ও দীপ্তি শর্মা। দলের সঙ্গে মিশে যেতে তাই সমস্যা হয়নি সালমার। সঙ্গে মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তো ছিলই।

জাহানারা আলম এ নিয়ে দ্বিতীয়বার মেয়েদের আইপিএলে খেলেছেন। গতবার জাহানারার ভালো পারফরম্যান্স বহির্বিশ্বের কাছে বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ভাবমূর্তি। বাংলাদেশের মেয়েরাও ‘আইপিএল’ মঞ্চে দাপট দেখাতে পারে! এবার তাই ডাক পান সালমাও। বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেটের বিজ্ঞাপনও করেছেন দুজন মিলেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

সালমা, জাহানারা দুজনই আরব আমিরাতে ৪ থেকে ৯ নভেম্বর হয়ে যাওয়া মেয়েদের এবারের আইপিএলে নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কেড়েছেন। সালমার দল ট্রেইলব্লেজার্স তো শিরোপাই জিতেছে টুর্নামেন্টের! ফাইনাল জিততে সালমার বোলিংয়ের ছিল অসামান্য অবদান। শিরোপার উল্লাসে তাই সালমাই ছিলেন দলের কেন্দ্রবিন্দুতে।

শিরোপা জয়ের পর দেশে ফিরলে কথা হয় সালমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘আমার এত আনন্দ লাগছিল! প্রথমবার খেলতে এসেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সবার সঙ্গে খুব মজা করছিলাম। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগছিল ওদের প্রশংসায়। সবাই বলছিল, “সালমা তুমি আজ যা বোলিং করেছ না! তোমার জন্যই আমরা চ্যাম্পিয়ন হলাম।”’

ফাইনালে জয় নিশ্চিত হতেই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটা স্টাম্প তুলে ফেলেন সালমা। কিন্তু এলইডি বাতি লাগানো থাকায় শেষ পর্যন্ত স্মারক স্টাম্প ভাগ্যে জোটেনি তাঁর। পরে অবশ্য সালমাকে অন্য একটি স্টাম্প দেওয়া হয়। সেটিতেই তাঁর সন্তুষ্টি, ‘ওই স্টাম্পটা না দিলেও অন্য আরেকটি স্টাম্প দিয়েছে। ওটাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার কাছে।’

default-image

সালমার আইপিএল অভিজ্ঞতায় বড় জায়গা জুড়ে আছে অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব। রিচা ঘোষ, সিমরান বাহাদুর, কাশফি গৌতমের মতো ভারতীয় তরুণীদের প্রিয় ‘দিদি’ এখন বাংলাদেশের সালমা। বাংলাদেশ দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক বলছিলেন, ‘আসার পর থেকে ওরা সব সময় আমার খোঁজ নিচ্ছে। টুর্নামেন্ট শেষ, কিন্তু বন্ধুত্ব রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে দীপাবলি গেল। সবাই মেসেজে আমাকে দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আমার কাছে এই জিনিসটা খুবই ভালো লেগেছে।’

আইপিএলে মাঠের পারফরম্যান্স আর মাঠের বাইরের বন্ধুত্ব মিলে ক্রিকেটকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছেন সালমা। বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের ভরাডুবির পর সালমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। আইপিএল সাফল্যের পর সালমা এখন স্বপ্ন দেখেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ করার। সে সঙ্গে মেয়েদের আইপিএলের সামনের আসরেও খেলতে চান তিনি, ‘স্বপ্ন এখন বড় হয়েছে। এত বড় টুর্নামেন্টে খেলে এসেছি! সামনেও মেয়েদের আইপিএলে খেলতে চাই। যেন আরও ২-৩ বছর তাদের দলে খেলতে পারি। চেষ্টা করব আরও ভালো করতে, যেন তারাও আমাকে ডাকতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ দলেও খেলে যেতে চাই আরও ৪-৫ বছর।’

জাহানারার জন্য এবারের আইপিএল ছিল নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার মঞ্চ। ভেলোসিটির হয়ে দুই ম্যাচ খেলে মাঠের খেলা দিয়ে ঠিক সেটিই করেছেন। ক্রিকেটার ও মানুষ হিসেবে একটু হলেও সমৃদ্ধ হওয়ার আশা নিয়ে আইপিএলে যান জাহানারা। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট আপনাকে সবকিছু শেখায়। সারাক্ষণ কিন্তু আপনি মাঠেই থাকবেন না। এর বাইরে ড্রেসিংরুম আছে, হোটেল আছে, আশপাশে বিভিন্ন রকম মানুষ আছে। সবার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হচ্ছে। একটা দেশের সংস্কৃতি জানছেন। এসবের মধ্যেই আপনি অনেক কিছু অর্জন করতে পারছেন। আপনি মানুষ হিসেবে সমৃদ্ধ হবেন। কারণ, সবকিছুর সমন্বয়ই হচ্ছে ক্রিকেট।’

বিজ্ঞাপন

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের দূত বলা যায় জাহানারাকে। ড্রেসিংরুম কিংবা টিম বাসে অন্য দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আড্ডায়-গল্পে তুলে ধরেন দেশের সংস্কৃতি। জাহানারা অবাক হয়েছেন বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশি ক্রিকেটারদের আগ্রহ দেখে, ‘আইপিএলের ড্রেসিংরুম অন্য রকম। এখানে একেকজন একেকজনের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। ভারত সম্পর্কে আলোচনা হয়। ভেলোসিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররা ছিল। ওদের দেশের সংস্কৃতি কেমন, এসব নিয়ে কথা হয়। সবারই বাংলাদেশ নিয়ে অনেক আগ্রহ। বাংলাদেশ নিয়ে কিছু না কিছু প্রশ্ন তাদের থাকেই। আমার উত্তরগুলো ওরা অবাক হয়ে শুনত।’

ভেলোসিটি দলের সতীর্থরা জাহানারাকে ডাকে ‘জাহান’ নামে। পুরো নাম উচ্চারণে নাকি তাদের কষ্ট। মাঠের বাইরের আড্ডায় সালমার মতো জাহানারাও শক্ত করে এসেছেন বন্ধুত্বের সুতাগুলো, ‘গতবারের চেয়ে এবার আরও বেশি উপভোগ করেছি। এবার আমার একটা পরিচিতি ছিল। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বটা আরও পোক্ত হয়েছে।’

সালমা-জাহানারার সাফল্য আর বন্ধুত্ব হয়তো উইমেনস টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জের দুয়ারটা আরও ভালো করেই খুলে দেবে বাংলাদেশের অন্য নারী ক্রিকেটারের সামনে।

মন্তব্য করুন