কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের এই স্বেচ্ছাসেবীরা ঢাকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া নারীদের শেষ শ্রদ্ধা জানান
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের এই স্বেচ্ছাসেবীরা ঢাকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া নারীদের শেষ শ্রদ্ধা জানানসংগৃহীত

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু তখন ভীতিজাগানিয়া ব্যাপার যেন। প্রিয়জন মারা গেছেন অথচ শ্রদ্ধা বা সস্নেহে ছুঁতে পারেননি অনেকে। অদৃশ্য ভাইরাসের ভয়ে শেষ সম্মানটুকু দেখাতেও তৈরি হয়েছিল অদৃশ্য দূরত্ব, তাই সন্তান ফেলে রাখছিল মা-বাবার মৃতদেহ, প্রতিবেশীর মৃত্যুতে এগিয়ে আসছিল না প্রতিবেশী। ঠিক সে সময়ে দাফনসেবার কাজ শুরু করেছিল কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের একদল নারী স্বেচ্ছাসেবী। প্রায় এক বছর ধরে তাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া নারীদের দাফনসেবা দিচ্ছেন। শুধু দাফনসেবা নয়, পরিবারের পক্ষ থেকে অন্যান্য ধর্মের নারীদেরও শেষ সম্মান জানাচ্ছেন ৩০ জনের দলটি উপদলে ভাগ হয়ে।

আশরাফুন নাহার রাজধানীতে এই নারী স্বেচ্ছাকর্মী দলটির দলনেতা। রাজধানীর কাকরাইলে স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য যে ক্যাম্প করেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, অন্যদের সঙ্গে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন বছরখানেক ধরে। ৪ এপ্রিল মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, শুনছিলাম দাফনসেবা দিতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার একটি রাজধানীর খিলগাঁওয়ের।

বিজ্ঞাপন
default-image

গত বছরের এপ্রিল কি মে মাসের করুণ সত্য গল্পটি অনেকটা এমন, রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি বাসা থেকে দাফনসেবা চেয়ে ফোনকল পেলেন আশরাফুন নাহাররা। পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী) পরে ছুটে গেলেন দলবলে। ছয়তলা বাসায় পা রেখেই অনুভব করলেন নিস্তব্ধতা। সিঁড়ি ভেঙে যখন ওপরে উঠছিলেন, ফ্ল্যাটের প্রতিটি দরজায় নজর দিয়ে দেখলেন ভেতর থেকে বন্ধ। বুঝলেন মানুষ আছে কিন্তু কারও সাড়া নেই। ছয়তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলেন মেঝেতে একজন নারীর নিথর দেহ। পরিবারের কেউ পাশে নেই, সবাই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। মৃতকে বাসা থেকে নামাতে গিয়ে অনেকটা বিপদেই পড়লেন আশরাফুন নাহার। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা চারজন ছিলাম। বাধ্য হলাম ছয়তলা থেকে মৃতদেহটি নামাতে। কিন্তু পিপিই পরে সরু সিঁড়ি বেয়ে মৃতদেহ নামানোটা ছিল অনেক কষ্টের। এমন কাজ তো কখনো করিনি। সেই অনুভূতি আজও মনে আছে।’

আশরাফুন নাহার নিজেই প্রায় ১০০ নারীর দাফনসেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, তাঁর নেতৃত্বে দলটি ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০-র বেশি নারীকে দাফনসেবা দিয়েছে।

আশরাফুন নাহার ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কয়েক বছর ধরেই কাজ করেন। দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলো, মৃত মানুষের দাফনসেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তিনি যুক্ত হন। তাঁর দলটির সবাই প্রায় শিক্ষার্থী, কেউ কেউ আছেন সদ্য স্নাতক। প্রমীলা আক্তার তাঁদেরই একজন।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে থেকে স্নাতক হয়ে চাকরিপ্রত্যাশী প্রমীলা ঢাকায় থাকতেন। গত বছর সরকার যখন ছুটি ঘোষণা করল, বন্ধ হলো ঢাকার হোস্টেলটি। তখন তিনি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। এরপর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন নারীদের দাফনসেবার কাজে। প্রমীলা বলছিলেন, ‘এমন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করব জেনে শুরুতে পরিবার থেকে রাজি ছিল না। এরপর ঈদে যখন বাড়ি ফিরতে পারলাম না, তখনো মন খারাপ হয়েছিল। তবে দিনে দিনে সেই পরিস্থিতি বদলেছে, আমরা যে মানুষের সেবায় কাজ করছি, এখন সবাই সাধুবাদ জানায়।’

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, অমানুষিক শ্রম, পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট, একটি ফোনকলে যেকোনো সময় ছুটে যাওয়ার দায়িত্ব মেনেছেন যে স্বেচ্ছাসেবকেরা, দিন শেষে এমন সাধুবাদই তো প্রাপ্তি তাঁদের।

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন