বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বর্তমানে হংকংয়ে ৪০ থেকে ৫০ জন পাহাড়ি নারী গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁদের মধ্যে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, খিয়াংয়ের সংখ্যা বেশি। হংকংয়ে তাঁরা মূলত বয়স্ক নারী ও ছোট শিশুদের দেখাশোনার কাজ করে থাকেন। সামগ্রিকভাবে গৃহকর্মী হিসেবে যাঁরা দেশের বাইরে কাজ করতে যাচ্ছেন, তাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও আমাদের অজানা নয়। তবে হংকংয়ের পাহাড়ি গৃহকর্মীদের অভিজ্ঞতার চিত্র ভিন্ন।

আমার জানামতে, পাহাড়িদের মধ্যে তাঁরাই প্রথম বিদেশে গিয়ে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও সংগঠিত হওয়ার জন্য ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে তাঁরা ‘হংকংপ্রবাসী নারী ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। প্রতি মাসে তাঁরা যেকোনো এক সাপ্তাহিক ছুটিতে হংকংয়ের সিমশাম সুই নামে একটি জায়গায় একত্র হন। এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার কারণ, সেখানে প্রচুর বাংলাদেশি, ভারতীয় ও নেপালি রেস্তোরাঁ আছে। দেশি খাবারের স্বাদ নিতে আর দেশি মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে কার না মন চায়! এখানে কাউলুন পার্ক নামে একটি সুন্দর নিরিবিলি পার্কও আছে। যেখানে বসে তাঁরা নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজ সমাজে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেসব আলোচনা করেন। একই সঙ্গে আলোচনা হয় গৃহকর্মী সম্পর্কে আমাদের দেশে থাকা প্রচলিত ধারণাগুলো কীভাবে বদলানো যায়, সে বিষয়েও।

গত এক বছরে এই সংগঠনের মাধ্যমে তাঁরা কয়েকটি সেবামূলক কাজও সম্পন্ন করেছেন। খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার দেওয়ান পাড়ার দুই অসহায় সহোদরা বৃদ্ধার জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়া, রাঙামাটি ও মানিকছড়ির আশ্রমে অনুদান, রাঙামাটির চন্দ্রঘোনার নুখ্যাইচিং মারমার ডান চোখে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃষ্টি ফেরাতে হংকংপ্রবাসী নারী ফাউন্ডেশন ভূমিকা রেখেছে।

default-image

ম্রেবাই মারমা (২৪) হংকংপ্রবাসী নারী ফাউন্ডেশনের অন্যতম সংগঠক। তিনি থাকেন ফোর্টরেস হিল এলাকায়। ছয় বছর ধরে হংকংয়ে কাজ করছেন। ম্রেবাই বলেন, ‘বিদেশে চাকরি করা নিয়ে অনেক গুজব শোনা যায়। আসার আগে তাই ভয় ছিল পরিবেশ কেমন হবে। কিন্তু জীবনে কিছু একটা করতে গেলে তো ঝুঁকি নিতে হয়। তাই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই এখানে আসি।’ নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে ম্রেবাই জানান, ‘ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। ঘরে সৎমা, অভাবের সংসার। স্কুল ছুটির পর আমার আর বাড়ি ফিরে যেতে মন চাইত না! ভীষণ মন খারাপ নিয়ে ফিরতাম। অভাবের সংসারে মুদির দোকানে বাবার প্রায়ই বাকি পড়ে থাকত! প্রতিদিন পাওনাদারেরা বাড়ি এসে বাবাকে বকাঝকা করে যেত। বাবা তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। এসব দেখে প্রায়ই মনে হতো, যদি কখনো সুযোগ হয় বাবাকে আমি সাহায্য করব।’

কুমিল্লা ট্রেনিং সেন্টারের পক্ষে একদিন হংকংয়ে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে বলে খাগড়াছড়িতে মাইকিং করা হচ্ছিল। তখনই আগ্রহী হন ম্রেবাই। পরে খাগড়াছড়ি থেকে বাছাই শেষে কুমিল্লায় প্রশিক্ষণ নিয়ে হংকং চলে যান। ম্রেবাই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বাবার অবস্থা এমন শোচনীয় ছিল যে হংকংয়ে আসার সময় আমাকে পকেট থেকে পাঁচ টাকাও দিতে পারেননি। কিন্তু হংকংয়ে এসে আমি ধীরে ধীরে বাবার সব ঋণ পরিশোধ করেছি, বাবাকে তীর্থ ভ্রমণে পাঠিয়েছি—এগুলোই আমার সবচেয়ে বড় প্রশান্তির জায়গা। এ ছাড়া হংকংয়ে আসার পরে আমার আরেকটি বড় অর্জন হলো আমি গ্রামে একটা ছোট্ট বাড়ি বানাচ্ছি। যে জমির ওপর বাড়িটি করছি, সেটা ছিল মায়ের নামে। কিন্তু মায়ের অসুখের সময় বাবা সেটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আমি আবার সেই জমিটি কিনে নিয়েছি। চেঙ্গী নদীর পাড়ে এ জমিটি প্রতি বর্ষায় প্রায় সময় ডুবে যায়! তবু আমি এ জমির মায়া কাটাতে পারিনি। আমার একটাই স্বপ্ন, চেঙ্গী নদীর পাড়ে আমার এই ছোট্ট ঘরে আমার আগামী দিনগুলো নিজের মতো করে কাটাব।’

ম্রেবাই মারমার বাবা আচাইপ্রু মারমা বলেন, ‘মেয়ে হংকং যাবে শুনে প্রথমে বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেয়ে সেখানে যাবার পর এখন আর দুশ্চিন্তা হয় না। আগে সংসারে অনেক অভাব–অনটন ছিল। এখন মেয়ে আমাকে মাসে মাসে টাকা পাঠায়। আগের মতো অভাব আর নেই। মেয়ে শুধু পরিবারের জন্য নয়, মানুষের জন্যও কাজ করছে। বাবা হিসেবে মেয়ের এ সাফল্যে আমি খুবই খুশি।’

খাগড়াছড়ির গুইমারার মেয়ে অংক্রাচিং মারমা। দুই বছর ধরে হংকংয়ে গৃহকর্মীর কাজ করছেন। এসএসসি পাসের পর অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চাকরি নিয়ে হংকংয়ে চলে যান। অংক্রাচিং মারমা বলেন, ‘কলেজে পড়াকালীন এই চাকরির খোঁজ পাই। আমি একপ্রকার যুদ্ধ করে এখানে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারীদের স্বাবলম্বী হওয়া দরকার। প্রত্যেক মা-বাবার স্বপ্ন থাকে মেয়ে লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হবে। একটা ছেলে বিদেশে চাকরি করতে গেলে প্রশ্ন ওঠে না, কিন্তু একটা মেয়ে চাকরি করতে গেলে প্রশ্ন ওঠে। এ বৈষম্যমূলক চিন্তাগুলো দূর করা দরকার। হংকংয়ে আসার আগে লোকে বলত সেখানে গেলে বিক্রি করে দেওয়া হবে। কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখার জন্যই আমি হংকং এসেছি। এখানকার পরিবেশ অনেক ভালো। হংকংয়ে আসার পেছনে আমার মায়ের উত্সাহ, সাহস ও প্রেরণা ছিল। তবে কেউ এখানে এলে কষ্টকে মেনে নিতে হবে। যেহেতু আমরা কাজের জন্য আসি, তাই কষ্ট স্বীকার করার মানসিকতাও থাকতে হবে।’

গত শতকের ষাটের দশকে, কাপ্তাই বাঁধের পরে পাহাড়ি নারীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার প্রবণতা প্রথম শুরু হয়। সেই প্রবণতা এখনো থামেনি। চিম্বুক পাহাড় থেকে এখনো উচ্ছেদ হওয়া ম্রো নারীর হাহাকার শোনা যায়। যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি নারী নানান প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে জীবননদী পাড়ি দিয়ে চলেছেন। তাঁদের সেই বন্ধুর পথচলার সীমা যেন অসীমে মিশে আছে। তাই তো জীবিকা এবং বাস্তবতার তাগিদে পাহাড়ি নারীরা তার কাজের কৌশলেও আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

কাজের জন্য পাহাড়ি নারীদের এ বিদেশ পাড়ি দেওয়াও একধরনের নতুন সম্ভাবনার খোঁজ দেওয়া। বিদেশে থাকা এই রেমিট্যান্স–যোদ্ধারা পরিবারে, সমাজে ও দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছেন। তাই প্রথা ভাঙা এই নারীদের কর্মের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো আমাদের কর্তব্য। স্যালুট রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের।

লেখক: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন