অচেতন এক নারীকে ধরাশায়ী করে নিয়ে যাচ্ছেন চারজন। একটু পরেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন অচেতন নারীর স্বামী সাকিব আলম। ধরাধরি করে গাড়িতে তোলা হয় ঝিলিক আলম নামের সেই নারীকে। ঝিলিকের স্বামী সাকিব মৃত স্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি চালান এবং হাতিরঝিলে গাড়ি দুর্ঘটনার নাটক সাজান। প্রমাণ করতে হবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন স্ত্রী।

কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফাঁস করে আসল গুমর। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাননি ঝিলিক, শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে তাঁকে। ঘটনাটি ঘটে ৩ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে। ঝিলিকের শরীরের নানা জায়গায় ছিল আঘাতের চিহ্ন। শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর সাজানো হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার নাটক। অথচ এই নাটকের নায়ককে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন মেয়েটি।

সংবাদমাধ্যমে নিহত ঝিলিকের মা তাহমিনা হোসেন জানান, বিয়েটা ভালোবাসার ছিল। কিন্তু শান্তির ছিল না। বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবরের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দুই পরিবারের অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে নির্যাতন সয়ে সয়ে শেষ রক্ষাও হলো না ঝিলিকের। অথচ মা–বাবার ঘরে সে ছিল আদরের দুলালী।

বিজ্ঞাপন

আমার মনে হয় প্রতিদিন তিলে তিলে মরতে মরতে গিয়ে এবার সত্যিই মরে গেলেন ঝিলিক। অথচ মা–বাবা তাঁকে বড় করেছিলেন আদর দিয়েই। এত আদরের কন্যারা শ্বশুরবাড়ি যান। মুখ বুঝে সংসার করেন। স্বামীর নিপীড়নের শিকার হন। শ্বশুর–শাশুড়ি আর তাঁদের আত্মীয়স্বজন দ্বারা প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এমন করবেই ধরে নিয়ে দিনের পর দিন তাঁরা মানসিক অশান্তি নিয়ে সংসার করেন। ভালোবাসার সংসার হয়ে যায় বিষের সংসার।

আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মেয়ে নেটওয়ার্ক’ নামে একটা গ্রুপে যুক্ত আছি। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চশিক্ষিত, উঁচু পদে চাকরি করা বহু নারীও এ গ্রুপের সদস্য। তাঁরা নামে-বেনামে নিজেদের জীবনের কথা বলেন। পারিবারিক জীবনের দুঃখ ভাগাভাগি করেন। এক-একজন নারীর জীবনের গল্প শুনি আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে রোমানা মঞ্জুরের মুখটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে দুচোখ হারিয়েছেন।

স্বামীর দ্বারা চরম মানসিক নির্যাতন তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টিও। অভিজ্ঞতাগুলো পড়ি। কয়েকজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগে জানতে পারি পরিস্থিতি আরও জটিল। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে ননদ-শ্বাশুড়িও নিয়মিত গায়ে হাত তোলেন। কর্মজীবী নারী, কেন আপনি এত মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করে ওঁদের সঙ্গেই আছেন? এই প্রশ্নের চিরাচরিত জবাব, সন্তান দুটোর জন্য। এই সমাজ তো একা একা দুটো সন্তান নিয়ে সুস্থভাবে জীবন-যাপন করতে দেবে না। স্বামী নামক ‘সাইনবোর্ড’ না থাকলে সমাজের প্রতিটি স্তরে হেনস্তা হতে হয়। তাই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মুখ বুঝে সহ্য করা। এমন নারীজীবন ঘরে ঘরে।

ঝিলিক হয়ে যাঁরা এখন বেঁচে আছেন তাঁদের পরিবারগুলোর কাছে প্রশ্ন—‘আপনার স্ত্রী কি আপনার শত্রু? আপনার পুত্রবধূকে কেন আপনি সহ্য করতে পারেন না? সে কি পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই একজন সদস্য না?’

বিজ্ঞাপন

মাথায় ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলো রাখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমের কাছে। তিনি বললেন, ‘আমাদের সমাজে একটি ছেলেকে বড় করা হয় সম্পত্তি হিসেবে। তার পেছনে খরচ করা হয় ভবিষ্যতের কথা ভেবে। বিয়ের পর ভাবা হয় ছেলে হাতছাড়া হয়ে গেছে। তো হাতছাড়া যার কারণে হলো তার প্রতি ছেলের পরিবারের সদস্যদের নেতিবাচক আচরণ প্রাচীন যুগ থেকেই। দিন দিন সেই নেতিবাচক আচরণ, আক্রোশ ভয়াবহতার রূপ নিচ্ছে। যার ফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই ঝিলিকদের এমন করুণ পরিণতি। ’

সাপে-নেউলে, দা-কুমড়া, বউ-শ্বশুরবাড়ি শব্দগুলো একই অর্থ বহন করে কেন? বউটি শ্বশুর–শাশুড়ির ঘরে তো ডাকাত হয়ে অনুপ্রবেশ করেনি। দুজন ব্যক্তির জানাশোনায়, দুই পরিবারের সম্মতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রী-পুত্রবধূটি তাদের পরিবারে আসেন। নিজের শিকড় উপড়ে নতুন পরিবেশে যেখানে সহমর্মিতায়, ভালোবাসায় নতুন জীবন শুরু করবেন সেখানে প্রতিনিয়ত বাঁকা চোখের সামনে যাপন করতে হয় চব্বিশ ঘণ্টা। চুন থেকে পান খসলেই পরের মেয়েকে তিরস্কার। এই পরের মেয়েটিই কিন্তু সব ছেড়ে আপনাদের কাছে এসেছেন। তাকে শত্রু বা প্রতিপক্ষ ভাবার তো দরকার নেই।

পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে স্ত্রী–পুত্রবধূর সঙ্গে ইতিবাচক-সুস্থ আচরণ করতে হবে। তিরস্কার-অবহেলা-অবজ্ঞা না করে কাছে টেনেই দেখুন না তাকে প্রতিপক্ষের মতো লাগবে না। কত অল্পতেই সম্পর্কগুলো সুন্দর হয়। পরিবারে স্বস্তি, শান্তি বিরাজ করে।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন