অলংকরণ
অলংকরণ আরাফাত করিম

‘মাইয়্যাটা যদি করোনায় মরত, তাও শান্তি পাইতাম। না জানি কত কষ্ট দিয়া মাইয়্যাটারে মারছে। আমি চাই আসামিগোর ফাঁসি হোক। আর কোনো অসহায় মায়ের যেন সন্তানরে হারাইয়্যা ফালাইতে না হয়।’ ৪০ বছরের বেশি বয়সী কল্পনা আক্তার মুঠোফোনে তাঁর ২০ বছর বয়সী মেয়ে মিশু আক্তারের খুনের বিচার চেয়ে কথাগুলো বললেন।

কল্পনা আক্তার একা নন, গত ছয় মাসে প্রায় ৩০০ জন মা এভাবে তাঁদের মেয়েকে হারিয়ে ফেলেছেন বা তাঁরা হিসাবের খাতা থেকে নেই হয়ে গেছেন। কল্পনা আক্তার যেমন বলছিলেন, আগে তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। এখন আছে এক মেয়ে আর এক ছেলে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে খুন হয়েছেন ২৩৪ জন নারী। আর এ সময়ে বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৬২ জন নারী। সব মিলে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ২৯৬। এ সময়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের হাতেও খুন হন ২৬ জন নারী।

বিজ্ঞাপন

কিশোরগঞ্জের কল্পনা আক্তার সন্তানহারা হয়েছেন গত জুলাই মাসে। মিশু যখন ছোট, তখন কল্পনার স্বামী মারা যান। ঢাকায় বিভিন্ন বাসায় কাজ করে কল্পনা ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। মিশুকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সাত ও পাঁচ বছর বয়সী দুই সন্তান আছে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তালাক দেন স্বামী। দুই সন্তানকে বাবার কাছে রেখে মিশু ফিরে আসেন মায়ের কাছে। করোনাভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেই মিশু ঢাকায় কাজের খোঁজে যান। হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি মো. মোখলেছ কাজের আশ্বাস দিয়ে ঢাকায় এনে তিনি আর তাঁর শ্যালক নাসির উদ্দিন মিলে মিশুর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যা করেন বলে কল্পনা আক্তারের অভিযোগ। গত ১৫ জুলাই নাসির মুঠোফোনে কল্পনাকে জানান, মিশু আগুনে পুড়ে গেছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কল্পনা হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর মেয়ে মারা গেছেন। লাশ মর্গে আছে। অন্যদিকে, মোখলেছ আর নাসিরের ফোন নম্বর বন্ধ পান। বাসায় গিয়ে দেখেন তালা দেওয়া। গত ১৭ জুলাই রাজধানীর বংশাল থানায় এই মা মামলা করেন। মেয়ের লাশ হাতে পান তিন দিন পর। তারপর মেয়ের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

মামলার অভিযুক্ত আসামি নাসির মিশুকে পুড়িয়ে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছেন। দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে আছেন।

আরেক মা নেত্রকোনার হাজেরা খাতুন। জীবনে প্রথমবার নেত্রকোনা শহর এবং ঢাকায় আসা এই মা রাজধানীর কাফরুল থানায় মেয়ে হত্যার মামলা করেন গত ৩১ জুলাই। দেড় বছর আগে মেয়ের বিয়ে হয়েছিল মো. সুজনের সঙ্গে। সুজন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজের দোষ স্বীকারও করেছেন।

হাজেরা খাতুনও হিসাব থেকে এক মেয়েকে বাদ দিয়ে বললেন, চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে এখন রইল তিন মেয়ে। হাজেরা আরও বললেন, ‘বাড়িত আনার পর মেয়ের লাশ দেখছি। সারা গায়ে খুব আঘাত করে মারছে। তোমরা দয়া কইরা আমার মেয়ে হত্যার বিচারডা কইরা দেও।’

আসকের প্রতিবেদন

নয়টি জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ ও আসকের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আসক সংখ্যাগত প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদন বলছে, গত ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরে ডিবি পুলিশ আটক করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইয়াসমিন বেগম নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। আর গত ছয় মাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জন নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন নারী। পারিবারিক নির্যাতনের পর ১৬৩ জনকেই স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সদস্যরা খুন করেছেন। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে, আর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৫ জন নারী। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা চার নারী খুন হয়েছেন।

হত্যার পেছনের কারণ

প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে নারীদের হত্যার পেছনে প্রাথমিকভাবে বা পুলিশের দেওয়া বক্তব্য থেকে কারণগুলোও উল্লেখ করা হয়েছে।

২ আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় প্রবাসী নারী রহিমা বেগমের (৬০) কাছে কিছু টাকা ধার
চেয়েছিলেন এক ব্যক্তি। কিন্তু তিনি তাঁকে টাকা না দিয়ে উল্টো ভর্ৎসনা করেছিলেন। এতে ক্ষোভে ও অপমানে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেন বলে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই ব্যক্তি আদালতে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।

৪ আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, ইয়াসিন মোল্লা স্বীকার করেছেন, স্ত্রী পরিচয় দেওয়া হাবীবা আক্তারকে বালিশচাপায় হত্যা করেছেন। একটি মোবাইল ফোনের কলকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি এ কাজ করেন।

অনৈতিক কাজের জন্য আনা নারীর সঙ্গে একপর্যায়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হলে অভিযুক্ত আসামি গলা টিপে হত্যা করেন। প্রথম আলোর ১০ জুলাইয়ের প্রতিবেদন বলছে, রাজধানীর পান্থপথে রাস্তায় পড়ে ছিল এই নারীর লাশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, আনসার আলী নিজেই নারীটির লাশ টেনে সেখানে ফেলে যান।

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় এক ব্যক্তি তাঁর সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে ধর্ষণের পর তাঁকে হত্যা করেছেন। গত ১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ওই ব্যক্তি এসব কথা বলেন।

গত ১৫ এপ্রিল ফেনীতে পারিবারিক কলহের জের ধরে তাহমিনা আক্তারকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করেন স্বামী ওবায়দুল হক ভূঁঞা। হত্যাকাণ্ডের সময় ওবায়দুল এ ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ‘লাইভ’ ধারণ করেন এবং এ ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করেন। পারিবারিক কলহের জন্য ফেসবুকের লাইভে স্ত্রীকে দায়ী করেন। তাঁর স্ত্রী পরিবারকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করতেন বলেও দাবি করেন।

বেসরকারি সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশের দেশিয় পরিচালক ফারাহ কবির বললেন, দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়েছে মার্চ মাস থেকে। আর গত ছয় মাসেই প্রায় ৩০০ নারীর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। বলা হচ্ছে, কাজ না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন পুরুষেরা। অথচ সেই একই অবস্থা তো নারীদেরও। নারীদের নামে তো এভাবে খুনের অভিযোগ আসছে না। নারীরাও একইভাবে খুন করা শুরু করলে পরিস্থিতির সামাল দেবে কে?

বিজ্ঞাপন
নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন