বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্বজিৎ: এই ঘটনার পরপরই কি আইনি লড়াইয়ে নামলেন?

সুমনা: না। ওই সময় আমার শারীরিক অবস্থা অনুকূলে ছিল না। তা ছাড়া স্বামীর কর্মসূত্রে আমি চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলাম। সব মিলিয়ে আমার কিছুদিন দেরি হয়ে গেল। ২০০৯ সালে আমি হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। আমার বাবা ও স্বামী এ সময় আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিশ্বজিৎ: তত দিনে আপনি চাকরিতে ঢুকে পড়েছেন। আপনার স্বামীও একজন প্রতিষ্ঠিত কার্ডিওলজিস্ট...। সরকারি চাকরির জন্য এতটা দৌড়ঝাঁপ করার কী প্রয়োজন ছিল?

সুমনা সরকার: চাকরির জন্য তো করিনি। একটা চাকরির জন্য মানুষ এত বছর ব্যয় করতে পারে না। আমি ১৮ বছর লড়াই করেছি মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই লড়াইয়ে আমি জিতেছি। আমার মুক্তিযোদ্ধা পিতা অধ্যাপক ডা. অমল কৃষ্ণ সরকারের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আইনি লড়াইয়ে নেমেছিলাম, আর নিজের মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। আমার বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা দিয়েছেন। পরে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে তো কথা উঠতে পারে না। আমি বিসিএস (বিশেষ) লিখিত ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় পাস করে মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। কারও দয়া বা করুণায় নয়, নিজের যোগ্যতায় এত দূর এসে মৌখিক পরীক্ষা দিতে পারব না কেন? এই প্রশ্নটাই ছিল আমার লড়াইয়ের ভিত্তি।

default-image

বিশ্বজিৎ: ২০০৩ সালে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় পাস করেছিলেন, তারপর ২০২১ সালে, মানে ১৮ বছর পর পাস করলেন মৌখিক পরীক্ষা। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।

সুমনা সরকার: ২০০৯ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করি। ২০১৫ সালে সেই রিটের পক্ষে রায় হয়। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) রায় স্থগিত করার জন্য আপিল করে। ২০১৬ সালে হাইকোর্টের রায় স্থগিত হয়। অতঃপর গত বছরের অক্টোবর মাসে আপিল বিভাগে লিভ টু লিভ আপিল নিষ্পত্তি হয়। পিএসসিকে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। এই যে আইনি লড়াই চালিয়ে গেলাম এত বছর, এটার ফল মিলল। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন অনেকেই আমাকে নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি সরে আসিনি। আমার স্বামী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ বরাবরই আমাকে সমর্থন করেছেন। বলেছেন, ‘তোমার প্রতি অন্যায় হয়েছে, তুমি লড়াই চালিয়ে যাও।’

বিশ্বজিৎ: এতকাল পরে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হাজির হলেন?

সুমনা সরকার: হ্যাঁ (হাসি), ১৮ বছর পর আবার যোগ্যতার পরীক্ষা দিলাম। তাতে উত্তীর্ণ হলাম। ৭ অক্টোবর ফল প্রকাশিত হয়েছে। পিএসসির ওয়েবসাইটে তার উল্লেখ রয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিশ্বজিৎ: সব মিলিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে এই প্রাপ্তিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সুমনা সরকার: দেখুন, পার্থিব প্রাপ্তি হচ্ছে, আমার বয়স অনুযায়ী আরও ১৩ বছর সরকারি চাকরি করতে পারব। আর সত্যিকার প্রাপ্তি হচ্ছে মেধার স্বীকৃতি আদায় ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। একদিকে আমার মুক্তিযোদ্ধা চিকিত্সক পিতার সম্মান পুনরুদ্ধার করেছি। আমার বাবা এই অর্জনটা দেখে যেতে পারলেন না (২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন), কিন্তু আমার ছেলে তো দেখল। সে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার সামনে মর্যাদার লড়াইয়ের একটা দৃষ্টান্ত রেখে যেতে পারলাম। কন্যা হিসেবে বাবাকে মর্যাদার আসন ফিরিয়ে দেওয়া আর মা হিসেবে ছেলেকে গৌরবের উত্তরাধিকারী করা—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

নারীমঞ্চ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন