default-image

কয়েক মাসে প্রায় ২ লাখ টাকার শুধু ছাতুই বিক্রি করেছেন নিপা সেনগুপ্তা। নিপার এভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে আছে অপ্রচলিত এক ফলের গল্প।

নিপা সেনগুপ্তা পড়তেন পাবনার পাকশী রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে। এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পাঁচ বছর পরে সনদপত্র তুলতে গিয়েছিলেন। দেখলেন পথের পাশের একটা ফলসাগাছ আছে, আগের মতোই। কিছু পাকা ফলও পড়ে রয়েছে নিচে। স্কুলে পড়ার সময়কার মতো কিছু ফল কুড়িয়ে নিলেন। হাতে ধরে ছবি তুললেন। এটা ২০১৩ সালের কথা।

সাত বছর পরে গত বছরের জুনে তিনি সেই ছবিটা নারী উদ্যোক্তাদের ফেসবুক গ্রুপ উইমেন অ্যান্ড ই–কমার্স ফোরাম (উই)-এ দেন। এরপর একের পর এক মন্তব্য আসতে থাকে। কেউ এটা সম্পর্কে জানতে চান, কেউ গাছের চারা কিনতে চান। ফলসা অপ্রচলিত ফল, কিন্তু এর পুষ্টিগুণ রয়েছে। খেতে টক-মিষ্টি। নিপা দেরি না করে চারার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। পেয়ে যান কিছু চারা। একে একে কুরিয়ারে পাঠাতে শুরু করেন। প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি ২০ হাজার টাকার চারা বিক্রি করেন।

বিজ্ঞাপন

ফলসার চারায় সাফল্য আসার পরে তাঁর মাথায় আসে পঞ্চব্যঞ্জন ছাতু ও যবের ছাতুর কথা। যব, গম, ছোলা, চাল ও মসুরের ডাল ভাজা মিশিয়ে পঞ্চব্যঞ্জন ছাতু তৈরি করতে হয়। দুটোই ধীরে ধীরে অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী। তিনি এই ছাতুর খোঁজে নেমে পড়েন। পেয়েও যান। এবার ছাতুর ছবি পোস্ট করেন। ব্যাপক সাড়া পান। গত ছয় মাসে প্রায় ২ লাখ টাকার ছাতু বিক্রি করেছেন। এখন তিনি চাষিদের বিনা মূল্যে বীজ দিয়ে যব চাষ করাচ্ছেন।

নিপা সেনগুপ্তা থাকেন রাজশাহী শহরে। তাঁর স্বামী একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। নিপা রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। করোনা পরিস্থিতির কারণে কলেজ বন্ধ। বাসায় বসেই ছিলেন। এই সময়টা তিনি কাজে লাগিয়েছেন।

নিপা ফেসবুক পেজ খুলেছেন। নাম দিয়েছেন ‘ঐতিহ্যবাহী কৃষি অমৃত স্বাদ’। তাঁর স্বামীর নাম অমৃত সরকার। বর্তমানে পণ্যসারিতে যোগ হয়েছে আরও ২৪টি অপ্রচলিত খাদ্যপণ্য। রাজশাহীতে যব চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিপা উদ্যোগ নিয়ে জেলার তানোরের চারজন চাষিকে বিনা মূল্যে বীজ দিয়ে যব চাষ করাতে উৎসাহিত করেছেন। এবার তাঁরা ১২ বিঘা জমিতে যব চাষ করেছেন। মাঝেমধ্যে যবের খেত দেখতে নিপা সেন মাঠেই চলে যান।

তানোরের যবচাষি মো. আনারুল ইসলাম (৪৫) বললেন, ‘পানির অভাবে এই এলাকার অনেক জমি পতিত থাকে। খুবই স্বল্প পানিতে যব চাষ হয়। নিপা সেনগুপ্তার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে তিন বিঘা জমিতে যব চাষ করছি।’

নিপার অন্যান্য পণ্য হচ্ছে কুমড়াবড়ি, বিরই চাল, কালো চাল, যবের আটা, যবের চাল, গমের ছাতু, গমের লাল আটা, পঞ্চব্যঞ্জন ছাতু, ঘি, কালাইয়ের ডাল, কালাইয়ের আটা, ঢেঁকিছাঁটা চালের আটা, চাকিতে ভাঙানো মসুর ও মুগডাল, কাউনের চাল, চিনা, তিসি, পাকা চালকুমড়া, কালিজিরা, আখের গুড়, খেজুরের গুড়, খেজুরের ঝোলা গুড়, ঢেপের খই ও মোয়া। এখন ৪৬টি জেলায় তাঁর পণ্য যায়। বেশি ক্রেতা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে।

৮ জানুয়ারি রাজশাহী নগরের শালবাগানে নিপা সেনগুপ্তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, কুরিয়ারে যত পণ্য পাঠিয়েছেন, তার রসিদ এক জায়গায় স্তূপাকারে জমা রেখেছেন। কয়েকটি রেজিস্টার খাতা খুলেছেন। যাঁদের কাছে পণ্য পাঠিয়েছেন, তাঁদের মুঠোফোন নম্বরসহ নাম–ঠিকানা লিখে রেখেছেন।

প্রথম ফলসাগাছের চারা নিয়েছিলেন যশোরের মেডিকেল শিক্ষার্থী ফাতেমা খাতুন। তিনি জানান, তাঁর গাছটা বেশ ভালো আছে। বেড়ে উঠছে। ঢাকার মাইদা চৌধুরী ছয়টি ফলসার চারা নিয়েছিলেন। ছয়টি গাছই তাঁর টবে বড় হচ্ছে। সামনে বর্ষায় তিনি গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবেন।

প্রতি সপ্তাহে চিকিৎসক সমীর সাহা নিপার কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ কেজি করে যবের ছাতু নেন। নেত্রকোনায় তাঁর অনাথ আশ্রমের শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করার জন্য তিনি এই ছাতু কেনেন।

এই উদ্যোগ সফল করতে উইয়ের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার ও উই গ্রুপের অ্যাডমিন রাজীব আহমেদের সহযোগিতার কথা বিশেষভাবেই বললেন নিপা। আর ঘরে স্বামী অমৃত সরকারের সহযোগিতা তো আছেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন