default-image

‘বড়োমামাদের কথা শুনে বুঝে নিয়েছে নীলু, এবার তারা দেশে যাচ্ছে, আর কোনোদিন দেশে না যাবার জন্য।’

কী অদ্ভুত একটা বাক্য, তাই না? নীলু নামের ১৪ বছরের ছেলেটা পরিবারের আরও অনেকের সঙ্গে দেশে যাচ্ছে, কিন্তু আর কোনো দিন নাকি দেশে না যাওয়ার জন্য! এ কেমন কথা! এই প্রশ্ন নীলুর মনেও খচখচ করছিল। অবশেষে ও জানতে পারে, ‘দেশ নাকি এবার ভাগ হয়ে গেছে’। তাই না চাইলেও বরিশাল, কুষ্টিয়া, চাঁদপুর, পাকশী—যে যেখানে আছে, সেখান থেকে ভিটেমাটি ফেলে সবাইকে চলে যেতে হবে কলকাতায়। সেখানে তৈরি করা হবে নতুন পাঁচতলা বাড়ি। সব শুনে নীলু প্রশ্ন করে, ‘খালটাকে তো আর পাবে না সেখানে। আর পুকুর? আর ওই–যে ঝুমকোজবা, স্থলপদ্ম, শিউলিফুলের গাছগুলি? সেগুলি পাবে কোথায়?’

নীলু কি আর সেগুলো পেয়েছিল? দেশ ছেড়ে চলে আসার সময় নদীর তীরে দাঁড়িয়ে হারুন নামের বন্ধুটা যে ওকে প্রশ্ন করেছিল, ‘কী রে, আসবি তো? আসিস আবার। আসবি?’ নীলু কি আর গিয়েছিল? আমরা এখন জানি, নীলু আর যায়নি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ওরা দেশ ছেড়ে নতুন এক দেশে গিয়ে থিতু হয়েছিল। আমরা এখন উপলব্ধি করি, সুপুরিবনের সারি নামের কিশোর উপন্যাসটা দেশ হারানো নীলুর মলাটবন্দী কষ্টগাথা।

গল্পের এই নীলু আসলে কে? লেখক নিজেই। ‘নতুন দেশে’ গিয়ে তিনি অনেক বড় হয়েছেন। দেশ–বিদেশে পড়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করেছেন আর করেছেন সাহিত্য সাধনা। তাঁর কবিতা এবং গদ্য মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছে বছরের পর বছর। এত সবের মধ্যে ছোটদের জন্যও কম লেখেননি তিনি; সব মিলিয়ে ২৩টি বই। গদ্য–ছড়ার বইগুলোতে ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর শৈশব আর বাংলাদেশের কথা। ২০১১ সালে প্রকাশিত ছোটোদের ছড়া কবিতা বইয়ে যেমন লিখেছেন, ‘আর যা–কিছু বোঝাতে চাও/বুঝেছি শেষমেশ/এপার বাংলা ওপার বাংলা/দুটোই আমার দেশ।’

default-image

তাঁর জন্ম এপার বাংলার চাঁদপুরে, দাদার বাড়ি বরিশালে, বেড়ে ওঠেন পাবনায়। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে। এই বিদ্যাপীঠের স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম সেরা স্মৃতিগদ্য ছোট্ট একটা স্কুল। তাঁর ভাষায়, স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু, মফস্বল শহর, পরিবার, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতির ‘টুকরো টুকরো ছবি’ নিয়ে এই বই।

তবে এই বইয়ের ‘চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার’ অংশটির কথা এখন খুব মনে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর লেখকের প্রতিক্রিয়া ছিল কলম থেকে একটি চন্দ্রবিন্দু ঝরে পড়ার মধ্য দিয়ে! এখন তাঁর মৃত্যুর পর আমাদের অনেকের কলম থেকেও হয়তো তেমনই চন্দ্রবিন্দু ঝরে পড়ছে। কারণ, ছোটদের জন্য লেখা তাঁর ছড়া পড়লে মনে হয়, আরে, একেই তো বলে ছড়া! মনে হয়, ঢেউয়ের তালে দুলছি কিংবা টক–ঝাল–মিষ্টি মিলিয়ে ভারি মজার এক খাবারের স্বাদ পাচ্ছি।

তাঁর ছড়া মানে ফুর্তি, তাঁর গদ্য মানেই অবাক পৃথিবী। তাঁর সব লেখা মানেই আমাদের জন্য ভালোবাসা। তাই তাঁকেও বলি, ‘আপনাকে ভালোবাসি, শঙ্খ ঘোষ!’

বিজ্ঞাপন
গোল্লাছুট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন