default-image

‘বিকাল ৫টায় দেখা হবে ছাদে।’ ছোট্ট চিরকুটে শুধু এটাই লেখা।

হাতের লেখা দেখেই মিশা ঠিক বুঝতে পেরেছে, এটা শিমু খালার লেখা। শিমু খালা থাকে মিশাদের বাড়ির চারতলায়। এ রকম চিরকুট আজই নতুন নয়। এই তো ঈদের ছুটিতে এ রকম করেই সবাইকে এক করলেন শিমু খালা। গানের আসর বসেছিল সেবার। আজও এ রকম কিছু হবে ভাবতে ভাবতে বারবার ঘড়ি দেখতে থাকল মিশা।

‘এত ঘড়ি দেখছিস কেন বারবার?’ জানতে চাইলেন মিশার মা।

মিশা বলল, ‘তুমি কি ভুলে গেলে?’

‘কী ভুলে যাব?’

‘ওই যে আজকে ছাদের আয়োজন।’

‘ওহ্, তাই তো! তোদের তো আজকে সভা আছে।’ মুচকি হেসে মা বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি তোকে মনে করিয়ে দেব।’

শিমু খালা কোনো আয়োজন করলে মা যে কখনো মানা করবেন না, মিশা তা ভালো

করেই জানে।

দুপুরের খাবার খেয়ে রোজকার মতো টিনটিন নিয়ে বসলেও আজ মন বসাতে পারল না মিশা। কখন শিমু খালা ডাকবেন, আর কখন ছাদে যাবে—তা–ই ভাবছে ও।

বিজ্ঞাপন

ঢং, ঢং! ঘণ্টি শুনতে না–শুনতেই ‘আমি গেলাম, মা’ বলে মিশা দিল দৌড়।

সিঁড়িতেই দেখা হলো আলভী ভাইয়া আর সোমার সঙ্গে। ছাদে গিয়ে দেখল, পাটি বিছিয়ে গোল হয়ে বসে আছে অনামিকা, রিহান আর প্রকৃতি আপু। ছোট্ট সাফিনাকে কোলে নিয়ে চলে এসেছে পাশের বাসার রুনা খালা।

‘তোমারা সবাই ভালো আছো তো?’ জানতে চাইলেন শিমু খালা, ‘আজকে তোমাদের সাথে খুব জরুরি কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলব।’

সবাই নড়েচড়ে বসল। শিমু খালা বলতে শুরু করলেন, ‘আজকে আমরা নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলব। তোমরা কি জানো, সুরক্ষা কী?’

‘সুরক্ষা মানে নিরাপদ।’ ঝটপট উত্তর

দিল সোমা।

‘ঠিক বলেছ। আমরা সবাই নিরাপদে থাকতে চাই, তাই না? আর তোমরা কি জানো, তোমাদের মতো সব শিশুর সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে? আমরা যারা বড়রা আছি, আমাদের দায়িত্ব সব শিশু যেন নিরাপদে থাকতে পারে, যেন সুরক্ষিত থাকতে পারে।’

‘আমরা তো নিরাপদেই আছি। কারণ, আমরা তো বাসায় থাকি, একা একা কখনোই বাইরে যাই না।’ বলল রিহান।

এটা শুনেই অনামিকা বলল, ‘আরে বোকা, তুমি তো ছেলে। তুমি তো সব সময় নিরাপদ। এটা মেয়েদের বলছে।’

শিমু খালা বললেন, ‘অনামিকা, তোমার মতো অনেকেই মনে করে যে শুধু মেয়েদের সাথেই এমন হয়। কিন্তু তা মোটেও ঠিক নয়। ছেলেশিশুরাও দুষ্টু মানুষদের থেকে নিরাপদ নয়। বুঝতে পেরেছ সবাই? এবার শোনো, রিহান, তুমি খুব ভালো বলেছ যে তুমি একা একা বাইরে যাও না। বাড়িতেই থাকো। কিন্তু আমরা বাড়িতে থাকলেই কি সব সময় নিরাপদ? সারা বিশ্বে শিশুদের সাথে কথা বলে, গবেষণা করে অনেকেই জানতে পেরেছে যে এমন অনেক শিশু আছে যারা বাড়িতেও নিরাপদ নয়। আর সেটা ছেলেশিশু ও মেয়েশিশু—সবার

জন্যই সত্য।’

আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, জানতে চাইলাম, ‘কেন নিরাপদ নয়?’

শিমু খালা এবার বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমাদের মা-বাবা যখন তোমাদের আদর করেন, তখন তোমাদের কেমন লাগে?’

সবাই চিৎকার করে বলল, ‘ভালো লাগে, অনেক ভালো লাগে।’

মনে রাখবে, কারও আদর যদি তোমার মন্দ লাগে, কেউ গায়ে হাত দিলে যদি তোমার খারাপ লাগে, তাহলে তাতে তোমার নিজের কোনো দোষ নেই। যে এই খারাপ কাজ তোমার সাথে করছে, সে অনেক সময় তোমাকে ভয় দেখাতে পারে, যাতে তুমি কাউকে বলে না দাও। অনেক সময় তোমাকে হয়তো কোনো খাবার বা খেলনার লোভও দেখাতে পারে। তখন তুমি কী করবে?

‘মা-বাবা ছাড়াও এমন আরও অনেকেই আছে, যারা আদর করলে তোমাদের ভালো লাগে, তাই না? এর বাইরে পরিবারের এমন কেউ থাকতে পারে বা অতিথি আসতে পারে, যারা আদর করলে তোমাদের হয়তো ভালো না–ও লাগতে পারে। কিংবা এমন কেউ তোমাদের গায়ে হাত দিলে বা আদর করলে তোমাদের হয়তো অস্বস্তি হতে পারে, ভয় লাগতে পারে অথবা হয়তো খারাপ লাগতে পারে। হতে পারে তুমি বাড়িতে থেকেও নিজেকে নিরাপদ মনে করছ না। এমন সময় তুমি কী করবে? তুমি প্রথমেই যেটা করবে সেটা হলো, জোরেশোরে বলবে, “না! আমার সাথে এমন করবে না।” কী করবে?’

‘না! আমার সাথে এমন করবে না।’ সবাই চিৎকার করে বলে উঠলাম।

‘বেশ ভালো! এখন বলো, তারপর কী করবে?’ জানতে চাইলেন শিমু খালা।

সবাই চুপ।

‘এবার তুমি দৌড়ে গিয়ে তোমার মা–বাবা অথবা তুমি যাকে সবচেয়ে বেশি আপন ও নিরাপদ মনে করো, তাঁকে গিয়ে বিষয়টা বলবে। মনে রাখবে, কারও আদর যদি তোমার মন্দ লাগে, কেউ গায়ে হাত দিলে যদি তোমার খারাপ লাগে, তাহলে তাতে তোমার নিজের কোনো দোষ নেই। যে এই খারাপ কাজ তোমার সাথে করছে, সে অনেক সময় তোমাকে ভয় দেখাতে পারে, যাতে তুমি কাউকে বলে না দাও। অনেক সময় তোমাকে হয়তো কোনো খাবার বা খেলনার লোভও দেখাতে পারে। তখন তুমি কী করবে?’

‘কেউ কোনো লোভ দেখালে শুনব না, কারও আদর খারাপ লাগলে বলব ‘না’। আর এমন কাউকে এই কথাটা বলব, যাকে আমি সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি।’ প্রকৃতি আপুর চটজলদি উত্তর।

‘আর মনে রাখব, আমার সাথে এমন কেউ যদি করে তাহলে সেটা আমার কোনো দোষ নয়।’ আলভী ভাইয়া আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল।

‘এই তো, তোমরা ঠিক ঠিক মনে রেখেছ!’

আরও কিছুক্ষণ কথা চলল। তারপর আমরা সবাই অনেক দিন পর ফুলটোক্কা খেললাম।

রাতে খাবার টেবিলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী নিয়ে আলোচনা হলো তোদের আজকে?’

আমি বললাম, ‘দুইটা গুরুত্বপূর্ণ কথা—এক. আমার সব সময় নিরাপদে থাকার অধিকার আছে। দুই. কোনো কিছু নিয়ে যতই খারাপ লাগুক না কেন তা নিয়ে আমি যাকে বিশ্বাস করি তার সঙ্গে কথা বলতে পারি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0