default-image

হেমন্তের এ রকমই দিনগুলোতে টুটুল ঢাকা শহরের ঘরে বসে পদ্মা নদীর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পায়। পাকা ধানের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। অনেক দূরের ছোট্ট গাঁ হালিশপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়। টুটুল ছটফট করে। ভোরে ঘর থেকে বেরিয়ে সে রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। ট্রেনের ভেতর থেকে ওরই বয়সী একটা ছেলে ভেংচি কাটে। টুটুলের মন খারাপ লাগে। ট্রেনের ভেতরের ওই ভেংচি কাটা ছেলেটা যেন টুটুলের নতুন জীবন। এই নতুন জীবন যেন ওকে প্রতিটা ক্ষণ ভেংচি কেটে চলেছে। তাই চার বছর ধরে ঢাকা শহরে বাস করলেও ওর মন পড়ে থাকে হালিশপুরে। কিন্তু সেখানে তো ওর আর কিছুই নেই। প্রিয় পদ্মা নদী ওদের ভিটেমাটি গিলে খেয়েছে। নদীভাঙনে যেদিন টুটুলদের বাড়িটা হারিয়ে যেতে শুরু করল, সেদিন যেন ওর বুকের পাঁজর ভেঙে যাচ্ছিল।

কেবল নদীভাঙনই নয়, মা–বাবা আর বোনের সঙ্গে ঢাকায় এসে টুটুল নিজেও ভেঙে পড়ে। ফুটবল মাঠে আর বাংলা পরীক্ষায় ভালো করেও টুটুল কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। পঁচিশে বৈশাখে বন্ধু আহসানদের বাড়ির উঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকে চমৎকার অভিনয় করে ও। সবাই প্রশংসা করে। তারপরও সব দূরের মনে হয়। ভিটেমাটি হারিয়ে কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে কাটাতে বাড়িতে সারাক্ষণ একটা চাপা কান্না ঘুরে বেড়ায়। ওর কিছুই ভালো লাগে না। এমনকি ওকে আপন করে নেওয়া আহসানের বোন বীণা আপাও একদিন ওদের বাড়িটার মতো হারিয়ে যেতে শুরু করে। টুটুল পদ্মার স্রোতে মাটি ভেঙে পড়ার ঝুপঝুপ শব্দ শুনতে পায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

টুটুল নামের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলেটার জন্য কেমন কষ্ট হয়, তাই না? ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায় উপন্যাসে টুটুলের জীবনের গল্প বলেছেন মাহমুদ আল জামান। নদী আর মন ভেঙে যাওয়া নিয়ে শিশু–কিশোরদের জন্য এমন উপন্যাস আমাদের কমই আছে। এই গল্প আমাদের নিজস্ব।

এমন আরও কিছু গল্প–উপন্যাস লিখেছেন মাহমুদ আল জামান। রানুর দুঃখ, ভালোবাসার কথাই ধরা যাক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গল্প। যেখানে রানু নামের মেয়েটার দুটি পা–ই অচল হওয়ার পথে। এক রাতে ওর বাবাকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। তার পরপরই রানু আবিষ্কার করে, ও আবার দাঁড়াতে পারছে, কিন্তু বাবা নেই। একইভাবে রাজীব নামের ছেলেটার কথাও বলা যায়। যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় দেখা যায়, রাজীব পথে নেমেছে।

মাথার ওপর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। দুপুরের রোদে ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাওয়া বড় ভাই কামালকে খুঁজতে নামে। হাজারো মানুষের ভিড়ে কামাল ভাইকে কি ও খুঁজে পাবে?

default-image

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাহমুদ আল জামানের আরেকটি উপন্যাস আছে—যুদ্ধদিনের পোড়োবাড়ি। মুক্তিযুদ্ধ এসেছে মাহমুদ আল জামানের সমুদ্র ও টুকুর গল্প বইয়েও। তবে মুক্তিযুদ্ধের আগ দিয়ে এক ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস টুকুকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাস নিয়ে এই গল্পে টুকু নামের ছেলেটা একের পর এক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। টুকুর গল্প পড়লে তুমি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোনো কিশোরের ছবি চোখের সামনে দেখতে পাবে। ওর দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ তোমাকে ছুঁয়ে যাবে। এ কারণেই মাহমুদ আল জামান অনন্য। তিনি আমাদের নিজেদের আনন্দ–বেদনার গল্প বলেছেন। এই বইগুলো এক মলাটে পাবে তাঁর কিশোরসমগ্র বইয়ে। বেরিয়েছে জার্নিম্যান বুকস থেকে। গল্প–উপন্যাসের বাইরে মাহমুদ আল জামান ছোটদের জন্য সূর্য সেন, চার্লি চ্যাপলিন এবং জসীমউদ্‌দীন নামের তিনটি জীবনীও লিখেছেন।

যাহোক, মাহমুদ আল জামানের গল্প–উপন্যাসের টুটুল, রানু, রাজীব আর টুকুকে ভোলা যায় না। তাঁর বই পড়লে পদ্মার স্রোতে মাটি ভেঙে পড়ার ঝুপঝুপ শব্দ, যুদ্ধদিনের দুপুরের তেজ কিংবা সমুদ্রের ঘ্রাণ আমরা টের পাই। মাহমুদ আল জামানের ইস্টিমার সারা জীবন সিটি দিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0