default-image

থ্রি থেকে ফোরে উঠব।

বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। বাড়িতে বাড়িতে পড়াশোনার ধুম। আমি নির্বিকার। বই নিয়ে বসতে ভালো লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেই বসাটা পুরোপুরিই ভান। সবাই দেখল, আমি বই নিয়ে বসে আছি, এই পর্যন্তই। তখন প্রতি সন্ধ্যায় সিলেট শহরে মজাদার ব্যাপার হতো—তার নাম ‘লেমটন লেকচার’। কথাটা বোধ হয়—‘লন্ঠন লেকচার’–এর বিকৃত রূপ। ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে জায়গায় জায়গায় সিনেমা দেখানো। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, ম্যালেরিয়া—এই সব ভালো জিনিস। আমাদের কাজের ছেলে রফিক খোঁজ নিয়ে আসে, আজ কোথায় লেমটন লেকচার হচ্ছে—মুহূর্তে আমরা দুজন হাওয়া।

লেমটন লেকচারের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামানোর অনেক চেষ্টা করা হলো। নামানো গেল না। মা হাল ছেড়ে দিলেন। এখন আর সন্ধ্যা হলে পড়তে বসতেও বলেন না। আমি মোটামুটি সুখে আছি বলা চলে।

বিজ্ঞাপন
যাহোক, প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হলো। দুজন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল, আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সব শিক্ষককে স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম।

এমন এক সুখের সময়ে মাথামোটা শংকর খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, তার মা তাকে বলেছেন সে যদি ক্লাস থ্রি থেকে পাস করে ফোরে উঠতে পারে তাহলে তাকে ফুটবল কিনে দেবেন।

সে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্য। কী করে এক ধাক্কায় পরের ক্লাসে ওঠা যায়। একটা চামড়ার ফুটবলের আমাদের খুবই শখ। সেই ফুটবল এখন মনে হচ্ছে খুব দূরের ব্যাপার নয়। সেদিনই পরম উৎসাহে শংকরকে পড়াতে বসলাম। যে করেই হোক তাকে পাস করাতে হবে। দুজন একই ক্লাসে পড়ি। এখন সে ছাত্র, আমি শিক্ষক। ওকে পড়ানোর জন্য নিজেকে প্রথম পড়তে হয়, বুঝতে হয়। যা পড়াই কিছুই শংকরের মাথায় ঢোকে না। মনে হয় তার দুই কানে রিফ্লেকটর লাগানো। যা বলা হয় সেই রিফ্লেকটরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, ভেতরে ঢুকতে পারে না।

যাহোক, প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হলো। দুজন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল, আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সব শিক্ষককে স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম।

এই ক্ষুদ্র ঘটনা বাবাকে খুব মুগ্ধ করল। বাসায় যে–ই আসে, বাবা তাকে বলেন, আমার এই ছেলের কাণ্ড শুনুন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছে। কারণ হলো...

এ ঘটনার আরেকটি সুফল হলো বাবা মাকে ডেকে বলে দিলেন, কাজলকে পড়াশোনা নিয়ে কখনো কিছু বলার দরকার নেই। ও ইচ্ছা হলে পড়বে, ইচ্ছা না হলে না। তাকে নিজের মতো থাকতে দাও।

আমি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম।

এই আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ, বিশেষ বিবেচনায় মাথামোটা শংকরকে প্রমোশন দিয়ে দেওয়া হলো। তার মা সেই খুশিতে তাকে একটা এক নম্বরি ফুটবল এবং পাম্পার কিনে দিলেন।

গ্রিন বয়েজ ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হলো। আমি ক্লাবের প্রধান এবং শংকর আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক আমাদের ফুলব্যাক। অসাধারণ খেলোয়াড়।

সূত্র: কাকলী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের আমার ছেলেবেলা বইয়ের ‘মাথামোটা শংকর ও গ্রিন বয়েজ ফুটবল ক্লাব’ অংশ থেকে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0