default-image

একটা তিনতলা বাড়ির দোতলায় থাকত তিনজন। মা, বাবা আর তাদের ছোট ছেলে ছোটন। এবারের বৃক্ষমেলা থেকে সে অনেক গাছ কিনে এনেছে, আর বারান্দায় একটা বাগান করেছে। নিজেই দেখাশোনা করে গাছগুলোর। একদিন ছোটন যখন স্কুলে, খুব মেঘ করে বৃষ্টি এল। ভাসিয়ে দিল পুরো বারান্দা। টব–বাগানের সব গাছ খুব নেচে মজা করে বৃষ্টিতে গোসল করল। কিছু খালি টব ছিল বারান্দায়। সেখানে পানি জমে গেল। আর সেই টলটলে পানি দেখে একটা মশার খুব পছন্দ হলো, সে এসে ডিম পাড়ল।

একদিন ডিম ফুটে বের হলো ছোট্ট একটা মশা। খুব মিষ্টি দেখতে সে। আর একটু লাজুক লাজুক। কথা কম বলে আর হাসি হাসি মুখে ঘুরে বেড়ায়। আদর করে মা–বাবা তার নাম দিল মশি। আর কী তার গানের গলা! মিষ্টি গলায় পোঁ পোঁ করে গান করত মশি। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনত।

কিন্তু মা মশা ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কিছুতেই সে কাউকে কামড়াতে চায় না। বলে, ওর নাকি হুল ব্যথা করে। মা বোঝে, এগুলো অজুহাত। প্রথমে বকাঝকা করে, তারপর আদর করে বুঝিয়ে বলল মা মশা। কিছুতেই কিছু হলো না। ওর এক কথা—যাদের বারান্দায় আমরা থাকি, তাদের কামড়ানো আবার কেমন কথা? ছোটনকে ওর খুব ভালো লাগত। বাসার সবাই ওকে কামড়ায়, এ জন্য লজ্জায় ওর সামনে যেত না মশি। পাতার পেছনে লুকিয়ে থাকত।

আসলে মশি ছিল ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষাশী। মানে ও কেবল নিরামিষজাতীয় খাবারই খায়। আরও সোজা করে বললে, মশি কাউকে কামড়াবে না, রক্তও খাবে না। প্রাণীদের অধিকার নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি দেখে ও এই সিদ্ধান্তে এসেছে। আর ও বই পড়ে অনেক কিছু শিখেছে। সবাই নিরামিষাশী হয়ে গেলে পৃথিবীটা যে কত ক্ষতি থেকে বেঁচে যেত! তাই সে এই ব্যাপারে অনড়। মশি দেখতে ছোটখাটো আর মিষ্টি করে কথা বললে কী হবে, নিজে সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে ওকে সরানো খুবই কঠিন। তাই মা হাল ছেড়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
মশির অবস্থা দেখে ফুলগুলো তো হেসেই কুটিকুটি। মশিও লাজুক লাজুক মুখ করে হেসে ফেলল। কিন্তু ফুলদের অনেক ধন্যবাদ দিল ওকে মধু খেতে দেওয়ার জন্য।

ছোটনদের টব–বাগানে ফুলগাছগুলোতে বেড়াতে আসত একটা মৌমাছি। তার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায় মশির। সে গল্প করে, মৌমাছিরও হুল আছে, কিন্তু সে সেটা এমনি এমনি কাউকে ফোটাবে না। শুধু শুধু কেউ তাকে ব্যথা দিতে এলেই হুলটা কাজে লাগাবে। আর তার যে কী ব্যথা! এক হাজার মশা মিলে কামড়ানোর চেয়েও বেশি ব্যথা! মৌমাছি মশিকে বলেছে, ‘বন্ধু, তুমি তো আমাদের মতো ফুলের মধু খেতে পারো!’ মশির খুব পছন্দ হলো বুদ্ধিটা।

মৌমাছি একদিন ওকে পাশের বাড়ির ছাদের বাগানে নিয়ে গেল। সেখানে অনেক অনেক ফুল। কত যে রং আর গালভরা তাদের নাম। মৌমাছি মশিকে শিখিয়ে দিল কীভাবে ফুল থেকে মধু খেতে হয়। মশি তো মধু খেয়ে খুব খুশি। কী মিষ্টি সেসব ফুলের মধু। কী যে মজা খেতে। মশি এমনই পেট ভরে মধু খেল যে ও আর উড়তেই পারছিল না! পেট ফুলে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে থাকল আধা ঘণ্টা।

মশির অবস্থা দেখে ফুলগুলো তো হেসেই কুটিকুটি। মশিও লাজুক লাজুক মুখ করে হেসে ফেলল। কিন্তু ফুলদের অনেক ধন্যবাদ দিল ওকে মধু খেতে দেওয়ার জন্য। ফুলেরা খুব খুশি হলো, আর বলল, ‘মৌমাছি তো আমাদের পুরোনো বন্ধু। আজকে থেকে তুমিও আমাদের বন্ধু! তোমার যখন খুশি এসো।’

সেদিন থেকে মশি শুধু মধু খায়। মশাদের মধ্যে সে একটু হ্যাংলা–পাতলা, কিন্তু মধু খেয়ে ওর গানের গলা আরও খুলে গেল। কী চমৎকার সুর ওর গলায়। ধন্য ধন্য পড়ে গেল চারদিকে।

তুমি যদি দেখো, কোনো মশা তোমার কানের কাছে মিষ্টি সুরে পোঁ পোঁ করছে, কিন্তু কামড়াচ্ছে না, তাহলে বুঝবে, এটা সেই নিরামিষাশী মশা। সবার আদরের ছোট্ট মশি!

মন্তব্য পড়ুন 0