default-image

আমার খুব ছোটবেলাটা কেটেছে পাবনায়। আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, তখন মেলায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখতাম। সে ছিল ভারি আনন্দের এক ব্যাপার! নতুন একটা বছর আসছে। তাই পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে পুরোনো দিনের সেসব মেলার কথা মনে করতেই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি। তুমিও নিশ্চয়ই মেলায় গিয়েছ, তোমারও নিশ্চয়ই মেলায় ঘুরতে ভালো লাগে। আমাদের কত মিল দেখো!

সত্যি বলতে, মেলাবিহীন বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না। ছেলেবেলায় দেখেছি, আমাদের মেলাগুলো হতো বিভিন্ন পার্বণ আর উৎসব ঘিরে। কারুশিল্পীরা নিজেদের হাতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে মেলায় হাজির হতেন। মেলা ছিল তাঁদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করার অন্যতম স্থান। মাটির পুতুল, পাখি, হাতি, ঘোড়া, গরু, লক্ষ্মীর সরা, বাঁশি, টমটম গাড়িসহ কত কিছু যে বানাতেন তাঁরা। প্রতিটি জিনিস এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো যেত না। এ ছাড়া মেলায় থাকত সোলা ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পাটি, তালপাতা ও বাঁশের হাতপাখা। মাটির তৈরি বাহারি রঙের শখের হাঁড়িগুলো দেখতে দারুণ লাগত। আর খাবারের কথা কত বলব! মুড়িমুড়কি, বাতাসা, নাড়ু, জিলাপি, রসগোল্লা—মনে হলেই তো জিবে জল আসে! এমন আরও কত কিছু যে থাকত মেলাগুলোয়, তা আর বলে শেষ করা যাবে না। মেলার সেসব সামগ্রী কিন্তু সাধারণ কোনো দোকানে পাওয়া যেত না। এ কারণে মেলা আমাদের খুব টানত, যেন খেলনা আর খাবারগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকত। আমরা কি আর ওই ডাক না শুনে থাকতে পারি?

তুমি যদি এসব সামগ্রীর যত্ন নাও, তুমি যদি আমাদের মেলা ভালোবাসো, তাহলে কিন্তু কারুশিল্পীরা আবার সব তৈরি করতে বসবেন। করোনাকালে নতুন বছর আসছে, এবারের বৈশাখে হয়তো কোনো মেলা বসবে না...

কেবল খেলনা আর খাবারের কথা বললেই তো হয় না। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা আর পুতুলনাচ। নাগরদোলা থেকে নামার পর মনে হতো গোটা দুনিয়া বন বন করে ঘুরছে। এক জায়গায় কতক্ষণ বসে থাকার পর মাথাটা ঠিকঠাক হতো।

তারপর আবার শুরু হতো ঘোরাঘুরি। যেতাম বায়োস্কোপের ওদিকটায়। তোমরাও হয়তো কেউ কেউ বায়োস্কোপ দেখেছ। কোনো কোনো মেলায় বানরের নাচ দেখে হাসিতে লুটোপুটি খেতাম। কোনো মেলায় জাদুকরের হাতসাফাই দেখে হতবাক হয়ে যেতাম বিপুল বিস্ময়ে। আবার কোনো মেলায় হয়তো মুগ্ধ হতাম দরদভরা কণ্ঠের কোনো লোকশিল্পীর গান শুনে।

১৯৫৬ সালে আমরা চলে আসি ঢাকায়। তখনকার ঢাকা ছিল খুব নিরিবিলি। রাজধানী শহর বলেই ঢাকার মেলাগুলোর আকর্ষণ ছিল অন্য রকম। এখানে আশপাশের সব অঞ্চলের তো বটেই, দূরদূরান্তের কারুশিল্পীরাও তাঁদের পসরা নিয়ে হাজির হতেন।

শুরুতেই যে বলছিলাম, কারুশিল্পীদের তৈরি নানান সামগ্রীর কথা, সেসব কিন্তু মহামূল্যবান। কারণ, এসব সামগ্রী একান্তই আমাদের। এসব পুতুল আমাদের মাটি দিয়ে তৈরি, এসব ঘোড়া কিংবা হাঁড়ি আমাদের মানুষের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি। এসব খাবারের রেসিপিগুলো আমাদের পূর্বপুরুষের। অর্থাৎ মেলার জিনিসগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ।

অথচ এখনকার মেলাগুলোয় এসব খেলনা কমই দেখা যায়। তুমি যদি এসব সামগ্রীর যত্ন নাও, তুমি যদি আমাদের মেলা ভালোবাসো, তাহলে কিন্তু কারুশিল্পীরা আবার সব তৈরি করতে বসবেন। করোনাকালে নতুন বছর আসছে, এবারের বৈশাখে হয়তো কোনো মেলা বসবে না। এটা ভারি কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু আগে তো ভালো থাকতে হবে। তাই নতুন বছরে সবার জন্য শুভকামনা। আগাম শুভ নববর্ষ।

বিজ্ঞাপন
গোল্লাছুট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন