বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। ছেলে আগেই গেছে, এবার স্বামীও গেল। কী করবেন তিনি এখন? ব্ল্যাকআউট, প্লেনের কড়কড়ানি, সাইরেনের তীক্ষ্ণ চিৎকার—এর মধ্যে কোথায় পথ, কোথায় উদ্ধার? মায়ের যে আর সহ্য হয় না। এর মধ্যে আরেক বিপদ, সামনের দুটো বাড়ির ছাদে বোমা পড়ে কয়েকজন মারা গেছে, কয়েকজন মারাত্মক জখম হয়েছে। ওসব বাড়ির লোকেরা ভয় পেয়ে সবাই মিলে এ বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে এতগুলো লোকের দেখাশোনার ভারটা মায়ের ওপর পড়েছে।

default-image

এত বিপদ, বিপর্যয়, যন্ত্রণায় তিনিই বা বেঁচে আছেন কী করে? সে কি অন্ধ শ্বশুর আর কিশোর ছেলের মুখ চেয়ে? জামীরও যে আর কেউ রইল না মা ছাড়া। ছেলের জন্যই যে তাঁকে বাঁচতে হবে। দুঃখের অমানিশা একসময় শেষ হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। উল্লাসে সবাই ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে গেছে। মা কোথাও বেরোননি। আধা মূর্চ্ছিতের মতো বিছানায় পড়ে আছেন। দলে দলে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আসছে, মায়ের বিছানা ঘিরে বসে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, বিলাপ করছে। মা কিছু বলতে পারছেন না। সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, ভাবছেন, এরা তো সবাই এই ঢাকাতেই ছিল, বিপদে, দুঃখে সব সময়ই ছুটে এসেছে, সাহায্য করেছে। এখনো দারুণ দুঃসংবাদ পেয়ে এসে চোখের পানি ঝরাচ্ছে। কিন্তু যারা মনে মনে ‘বিদায় দে মা’ বলে যুদ্ধে গিয়েছিল, তারা কই?

মা শুনেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছে। রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ আর করতে হয়নি, তার আগেই ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যসহ জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় ঢুকেছে বিজয়ীর বেশে। তাদের স্টেনগানের গুলির ফাঁকা আওয়াজে আকাশ মুখর। তিনি যে এখন তাদেরই দেখতে চান।

ফোনের লাইন, বিদ্যুতের লাইন সব বিচ্ছিন্ন। সারতে এখনো দু-চারদিন লাগবে মনে হচ্ছে। ১৭ তারিখে সন্ধ্যার পর একটা মোমবাতি জ্বেলে মা জামীকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে ছিলেন। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। তার আগে বাসার সামনে জিপ থামার শব্দ শোনা গেছে। মা উঠে দরজা খুললেন। কাঁধে স্টেনগান ঝোলানো কয়েকজন তরুণ দাঁড়িয়ে। মা দরজা ছেড়ে দুই পা পিছিয়ে বললেন, ‘এসো, বাবারা, এসো।’

ওরা ঘরে ঢুকে প্রথমে নিজেদের পরিচয় দেয়, ‘আমি মেজর হায়দার। এ শাহাদাত, এ আলম, ও আনু, এ জিয়া, ও ফতে আর এ চুন্নু।’

মা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে। যত জন গিয়েছিল, সবাই ফেরেনি, তবু কয়েকজন তো ফিরেছে।

গোল্লাছুট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন