default-image

‘খালাম্মা, আপায় ভূতের বাচ্চা নিয়া আসছে!’

পুলির গুলমার্কা কথা শুনে তানহার কান্না পেল। ভূত কি কেউ এভাবে হাতে ধরে নিয়ে আসে? ভূত আনার জন্য লাগে বোতল, বয়াম বা কলসি। এসব কিছুই জানে না পুলি। ড্রাইভার আঙ্কেলটাও পাজি। স্কুল থেকে ফেরার পথে গাড়িতে বসেই তানহা দেখতে পেল, রাস্তার ওপরে ছোট্ট একটি বিড়ালছানা বিপদে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে রাস্তার কাদায় বেকায়দায় পড়ে গেছে। রিকশা-গাড়ি যাচ্ছে আর বেচারা কাদাতে মাখামাখি হচ্ছে। ড্রাইভার আঙ্কেলকে তানহা বিড়ালের বাচ্চাটাকে বাঁচাতে বলল। তিনি ফিক করে হেসে দিলেন। বললেন, ‘বিলাই দেখলে মনে হয় কিলাই! ওইটারে কাদাপানিতে আরও কয়েকবার চুবানি দেওন দরকার। তাইলে বুঝব পৃথিবী কেমুন জায়গা!’

তানহার চোখে পানি চলে এল। রেগে বলল, ‘গাড়ি থামান আপনি।’

দুম করে গাড়ি থামল। গাড়ির দরজা খুলে তানহা বৃষ্টির মধ্যেই সোজা চলে গেল বিড়ালের বাচ্চাটির কাছে। হাতের তোয়ালে দিয়ে তাকে আলতোভাবে ধরে তুলে নিয়ে এল গাড়িতে। অবলা পশুপাখি, এমনকি মাছ দেখলেও তানহার মন কাঁদে। এমন ভালোবাসার কারণেই তাদের বাসাভর্তি এখন কুকুর-বিড়াল, বারান্দার খাঁচায় পাখি আর ড্রয়িংরুমের অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ। কেউ কোনো অবলা প্রাণী কুড়িয়ে পেলে তানহাকে দিয়ে যায়। তানহাদের বাসায় গেলে এসব দেখে তোমাদের ভালো লাগবে; তবে অ্যাকুয়ারিয়াম দেখলে মোটামুটি হতাশ হবে। সেখানে গোল্ডফিশের বদলে রাখা আছে শিং মাছ! কারণ, সংবাদপত্র পড়ে তানহা জেনেছে, অ্যাকুয়ারিয়ামে থাকলে গোল্ডফিশের খুব কষ্ট হয়, তাদের স্ট্রেস বেড়ে যায়।

পুলি আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘খালাম্মা, ভূতের বাচ্চা দেইখা যান। জন্মের কালা।’

তানহা বলল, ‘ছি, পুলি! তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? ওর মা নেই। বৃষ্টির পানিতে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। তাই আমি তুলে এনেছি।’

তানহার মা এসে দেখলেন তোয়ালের মধ্যে কালো রঙের ছোট্ট একটি বিড়ালছানা আদুরে চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘যাও, একে সাবান দিয়ে ডলে এখনই গোসল করাও। না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে।’

পুরো পৃথিবীতে একমাত্র মা-ই তানহাকে বুঝতে পারেন। বাবাও এসব প্রাণীকে খুব আদর করেন। তিনি বাসায় থাকলে বলতেন, ‘পিচ্চি মেহমানকে দুধ-মাছ খেতে দাও, মা।’

বিজ্ঞাপন
আদরের ক্যাকটাসের পেছনের পা দুটো ভেঙে গেছে। মা-বাবা ও তানহা মিলে ক্যাকটাসকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেল। চিকিৎসক আঙ্কেল অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। বললেন, ‘ওর নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে...

দিনে দিনে বিড়ালছানা বড় হচ্ছে। তাকে দেখলেই বোঝা যায়, মহা আনন্দে আছে। নখ দিয়ে হালকা আঁচড় কাটতে পারে বলে মা তার নাম দিয়েছেন ‘ক্যাকটাস’। তানহা ক্যাকটাসের গলায় লাল ফিতা বেঁধে দিয়েছে আর ঝুলিয়ে দিয়েছে ঘণ্টি। ক্যাকটাস হাঁটে আর ঘণ্টি টুংটাং করে। তারপরও একদিন বাসার সবাই যখন ব্যস্ত, তখন দরজা খোলা পেয়ে ক্যাকটাস ঘর থেকে বের হয়ে গেল। সিঁড়ির রাজ্যে খানিকক্ষণ খেলেটেলে ভুলে গেল বাসার ঠিকানা! শেষমেশ তানহাদের বাসা ভেবে অন্য বাসায় ঢুকে পড়ল। সেই বাসায় থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে পাজি দুই ভাই—রুশো আর মুশো। হালকা ওজনের কিউট বিড়ালছানা পেয়ে তারা ভীষণ খুশি। ভাবল, একে বল বানিয়ে ছোড়াছুড়ি খেলা যাবে!

রুশো-মুশো বারান্দায় নিয়ে গেল ক্যাকটাসকে। রুশো ক্যাকটাসকে ছুড়ে মারল মুশোর কাছে; আবার মুশো তাকে ছুড়ে মারল রুশোর কাছে। ঘণ্টির টুংটাং শব্দ হতে থাকল।

দুই ভাই আনন্দে আত্মহারা। অন্যদিকে চারতলার ওপরে এভাবে শূন্যে ছোড়াছুড়ির জন্য ক্যাকটাস ভয়ে কুঁকড়ে রইল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঘটল দুর্ঘটনা। বারান্দা থেকে ঠুস করে নিচে পড়ে গেল বেচারা ক্যাকটাস!

আহত বিড়ালছানাটি দেখে তানহা অনেকক্ষণ কাঁদল। তার আদরের ক্যাকটাসের পেছনের পা দুটো ভেঙে গেছে। মা-বাবা ও তানহা মিলে ক্যাকটাসকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেল। চিকিৎসক আঙ্কেল অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। বললেন, ‘ওর নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ও আর কোনো দিন পেছনের পা দিয়ে হাঁটতে পারবে না।’ ক্যাকটাসের চিকিৎসা চলতে থাকল কিন্তু তাকে হাঁটতে হয় সামনের দুই পা দিয়ে। কোনোভাবে টেনেহিঁচড়ে সে চলাচল করে। এ দৃশ্য দেখে তানহার খুব কষ্ট লাগে। মনে মনে ভাবে, ক্যাকটাসের জন্য যদি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে বেচারার কিছুটা আরাম হতো। তানহা কাউকে জানায়নি; তবে মনে মনে ঠিক করেছে, বড় হয়ে সে ভেটেরিনারি চিকিৎসক হবে আর অবলা প্রাণীরা কোনো অসুখে বা দুর্ঘটনায় যেন কষ্ট না পায়, সে জন্য কাজ করবে। স্কুলের স্যার-ম্যাডাম খেয়াল করলেন, হঠাৎ পড়াশোনায় খুব ভালো করতে শুরু করেছে তানহা। এর কারণ কেউ না জানলেও তানহা ঠিকই জানে—সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়।

গোল্লাছুট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন