default-image

এক সন্ধ্যায় আমাদের বাসার ব্যালকনিটায় বসে ছিলাম। আকাশে ঘন কালো মেঘ, তার ওপর ঝোড়ো হাওয়া। মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশটা আমার খুব চেনা। অনেক দিন একই জায়গায় থাকলে যা হয় আরকি। এমন সময় হঠাৎ বাবা ডাকলেন, ‘পাখি।’

‘জি, বাবা।’

‘শোনো মা, আজ আমার বদলি হয়েছে। কাল আমি চলে যাব। পরশু তুমি আর তোমার মা মিলে চলে আসবে। একটু তাড়াতাড়ি জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে নাও, কেমন?’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলাম সেখান থেকে। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা। চাকরির সুবাদে তাঁকে নানা জায়গায় যেতে হয়। তবে এ জায়গায় একটু বেশি দিনই ছিলাম।

আমি দৌড়ে গেলাম আমার পোষা পাখি টুইয়ের কাছে। ওকে অনেক দিন আকাশ দেখাতে নিয়ে যাই না। কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে।

কিন্তু আজ ওকে হাতে নিয়ে খুব আদর করতে

ইচ্ছে করল।

‘কী রে, টুই? যাবি আমার সঙ্গে আকাশ দেখতে? খুব তো তাকিয়ে থাকতি যখন আকাশ দেখতে নিয়ে যেতাম।’

টুই কিছু বলে না, শুধু আমার দিকে কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। যেন কিছুই বলার নেই ওর।

‘জানিস রে টুই, বাবার বদলি হয়ে গেছে।

কী করব বল তো? এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না আমার।’

বিজ্ঞাপন
আগে যে বাসাটায় থাকতাম, সেখানে অনেক বড় জায়গা ছিল। এক পাশে ফুলের বাগান, আরেক পাশে খেলার মাঠ। আর ব্যালকনি থেকে আকাশটা কী সুন্দর দেখাত! ওখানকার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতাম, ঘুরতাম। বুঝলি টুই, এখন বিকেল হলে কেউ বলে না, আয় নিলু, খেলবি চল। কেউ বলে না, আমাদের ছেড়ে যাবি না তো? বললে আমিও তখন দিব্যি হেসে বলতাম, কোথায় আর যাব?’

গুলিস্তানে বাস থেকে নেমে সোজা পুরান ঢাকায় এলাম আমরা। বাবার বদলি হয়েছে রাজধানীতে। মস্ত বড় শহর। এখানে আগেও এসেছি, কিন্তু কখনো দীর্ঘ সময় থাকা হয়নি। এখানে কোথাও খেলার মাঠ, বাগান কিংবা খোলা জায়গা চোখে পড়েনি। এত এত দালানের ভিড়ে হয়তো কারও আকাশ দেখার সুযোগ মেলে না। আমি টুইয়ের দিকে তাকালাম। ভাবলাম, ওকে এখন আকাশ দেখাব কী করে! তাই প্রথম দিনটা মন খারাপ করে টুইকে নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকলাম। এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল।

সেদিন বিকেলে হঠাৎ ছাদে যেতে ইচ্ছে করল। মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পর গেলাম ছাদে। অনেক দিন আকাশ দেখিনি তো। ভেবেছিলাম, আজ হয়তো অনেক দিন পর আকাশ দেখতে পাব। কিন্তু হলো না। ছাদ বন্ধ, ব্যালকনিও নেই। তাই বাধ্য হয়ে ঘরের ছোট বারান্দায় এলাম। আকাশের দিকে তাকাতেই চোখ পড়ল টুইয়ের ওপর। দেখলাম, ও ভীষণ জড়সড় হয়ে বসে আছে। ইদানীং ওকে খাবার দেওয়া হয়ে ওঠে না আমার। মা এসে খাবার দিয়ে যান। টুইয়ের কাছে অতটা আসাও হয় না।

‘এই টুই, রাগ করেছিস?’

আমার কথায় যেন নীরবে সায় দিল টুই।

‘অনেক দিন তোর কাছে আসিনি, না রে? ভালো লাগে না আসলে। তুই তো বুঝিসই। আগে যে বাসাটায় থাকতাম, সেখানে অনেক বড় জায়গা ছিল। এক পাশে ফুলের বাগান, আরেক পাশে খেলার মাঠ। আর ব্যালকনি থেকে আকাশটা কী সুন্দর দেখাত! ওখানকার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতাম, ঘুরতাম। বুঝলি টুই, এখন বিকেল হলে কেউ বলে না, আয় নিলু, খেলবি চল। কেউ বলে না, আমাদের ছেড়ে যাবি না তো? বললে আমিও তখন দিব্যি হেসে বলতাম, কোথায় আর যাব?’

বিজ্ঞাপন

এভাবে এক মাস কেটে গেল। নিজেকে ঘরের এক কোণে বন্দী করে ফেললাম। না কিছু খেতাম, না কিছু পড়তাম, সারা দিন নিশ্চুপ হয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকতাম। একদিন উপলব্ধি করলাম, আমিও টুইয়ের মতো হয়ে গেছি। উপলব্ধি করতে পারলাম বন্দিজীবনের কষ্ট। মা-বাবা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আমাকে নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করতেন, কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পেতেন না। এভাবে আরও দু-চার দিন কেটে গেল।

পাঁচ দিনের মাথায় আমি যেন আর থাকতে পারছিলাম না। ছুটে গেলাম বারান্দায়, টুইয়ের কাছে। গিয়ে দেখলাম, আজ আমার টুই দাঁড়িয়ে আছে। বেশ চনমনে। মুখ ফুটে কিছু বলতে না পারলেও আমি ওর চোখ দেখে বলে দিতে পারি, ও কী বলতে চায়। অনেক দিন ওর সঙ্গে আছি তো, কেমন মায়া পড়ে গেছে।

অনেক কষ্ট হবে জেনেও খাঁচার দরজাটা খুলে দিলাম। টুইকে বললাম, ‘সাবধানে যাস, কেমন?’

মন্তব্য পড়ুন 0