default-image

অনেক দিনের জমানো টাকায় পাখি কিনে বাসায় যাচ্ছি। তোতা পাখি কিনেছি, সঙ্গে নতুন খাঁচা। পাখিটা খুব সুন্দর। একটা পাখি পোষার অনেক দিনের শখ ছিল। তাই খুব ভালো লাগছে। পাখি কিনেছি দুপুর বারোটায়, কিন্তু বৃষ্টির জন্য সাড়ে বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো। বৃষ্টি ধরে

এলে রাস্তায় নামলাম। রাস্তাটা কেটেছে বলে কাদা হয়ে গেছে। সাবধানে না চললে পিছলে পড়ে

যেতে হবে।

দেখতে দেখতে সত্যিই একজন পিছলে পড়ে গেল! ফিক করে হাসি বেরিয়ে এল আমার ভেতর থেকে। ওদিকে লোকটাকে সাহায্য করতে করতে আরেকজন বলল, ‘ভাই সাহেব, দেখে চলেন।’

লোকগুলোকে দেখতে দেখতে বেখেয়াল ছিলাম। তাই হঠাৎ করে ভারসাম্য হারিয়ে ফেললাম। আরেকটু হলে পিছলে পড়তাম! এমন সময় খাঁচার ভেতর থেকে তোতা বলে উঠল, ‘ভাই সাহেব, দেখে চলেন!’

আমি তো হতভম্ব! বলে কী এই পাখি! এত কথা জানে? হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে তোতার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুই তো অনেক কথা বলতে পারিস রে, তোতা! তাহলে বল তো, “ভাই, কেমন আছেন?”, “ভাই, কিছু খাওয়ান”, “ভাই, এবার যাই”...।’

আমার কাণ্ড দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলে আমাকে দেখে হাসতে লাগল। তাই আমি তোতাকে নতুন কথা শেখানো বন্ধ করলাম। বাসায় যাওয়ার পথে ভাবলাম, পাখিটার নাম কী রাখতে পারি। তোতু? নাকি কথুক? নাহ্, ভালো নাম মাথায় আসছে না। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, পাখিটাকে একটা গান শেখাব। ওই যে সেই গানটা—‘হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে...।’

বাসায় পৌঁছেছি। আমার রুমের পড়ার টেবিলের ওপর খাঁচাসহ পাখি রেখে বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গেলাম। বাথরুমে ঢোকার সময় দেখি, আমার ছোট বোন ঘরে ঢুকছে। ভাবলাম, পাখি দেখতে চায়। দেখুক। কিন্তু এটা যে মস্ত বড় ভুল হবে, তা বুঝতে পারিনি। হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে দেখি, আমার বোন বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোতাপাখিকে মুক্ত করে দিয়েছে! তোতা আর আমার কাছে নেই।

মনে মনে ভাবলাম, পাখিটি ছাড়িল কে?

আমার আপন বোন!

বিজ্ঞাপন
ছোট বোন চলে গেল। আমার যেন বুক ভেঙে আসছে! একটা পাখি নিয়ে এলাম শখ করে; আনতে না আনতেই চলে গেল! আর এমন পাখি কি সচরাচর দেখা যায়!

ছুটে বারান্দায় গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে; পাখি উড়ে গেছে। বোনকে খুব কড়া ধমক দেব, এমন সময় পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ পেলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখি, আমার তোতা সানশেডের ওপর বসে আছে! আমাকে দেখেই বলল, ‘ভাই, কেমন আছেন?’

আমি হতবাক। এরপর তোতাপাখি ওড়ার প্রস্তুতি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ভাই, এবার যাই।’ এরপর সত্যি সত্যি উড়ে চলে গেল! আমার মাথায় তখন আগুন ধরে গেছে। রাগে–দুঃখে যেন ফেটে পড়ব! বাসায় ছুটে গেলাম ছোট বোনকে আচ্ছা করে বকে দেওয়ার জন্য।

কিন্তু শেষমেশ নিজেকে শান্ত করলাম। ওর দিকে আগুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাখিটা ছাড়লি কেন?’

ছোট বোন বলল, ‘করোনায় বুঝতে পেরেছি বন্দী হয়ে থাকতে কেমন লাগে। তাই ওকে

ছেড়ে দিয়েছি।’

আমি ওর যুক্তি শুনে কী বলব ভেবে পেলাম না। কিছুক্ষণ ওর দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললাম, ‘দূর হ চোখের সামনে থেকে!’

ছোট বোন চলে গেল। আমার যেন বুক ভেঙে আসছে! একটা পাখি নিয়ে এলাম শখ করে; আনতে না আনতেই চলে গেল! আর এমন পাখি কি সচরাচর দেখা যায়! বিছানায় শুয়ে পাখিটার কথা ভাবতে ভাবতে কান্নাও চলে এল। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল সেই বিকেলে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনের আমগাছগুলোতে হাজারো পাখি উড়ে আসছে। ওদের প্রাণখোলা ডাক শুনে মনে হলো, আমার ছোট বোন ঠিক কাজই করেছে!

গোল্লাছুট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন