জীবন যেমন

অনিশ্চয়তার দোলাচল

অনিশ্চয়তার দোলাচল
বিজ্ঞাপন

সিঙ্গাপুর থেকে বাবার অসুস্থতার খবর শুনে দেশে এসেছিলাম। গত ৯ মার্চ যখন ঢাকায় পা রাখলাম, তখন সবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছে দেশে। ভেবেছিলাম কয়েক দিন থেকেই ফিরে যাব। কিন্তু দিনে দিনে করোনাভাইরাস নামের মহাবিপদ পৃথিবীটাকে নিস্তব্ধ করে দিল। আমি আটকে গেলাম। আমার মতো হাজারো শ্রমজীবীর স্বপ্ন ভেঙে গেল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সামান্য কিছু সঞ্চিত অর্থ ছিল, বাবার চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে গেল। ধারের জন্য কারও কাছে হাত পাতব, তারও উপায় নেই। সবাই ভাবে আমি লাখ লাখ টাকা সঙ্গে এনেছি! পরিবারের সদস্যরা যেন তা মনে না করেন, তাই বাবাকে বলেছিলাম, আমি খালি হাতে এসেছি। বাবার চিকিৎসার জন্য পারিবারিক কিছু জমিও বিক্রি করতে হলো।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এদিকে বাসায় বসে থেকে আমি ক্লান্ত হয়ে উঠলাম। ঘরবন্দী জীবনটা আমার কাছে অসহ্য যন্ত্রণার মনে হচ্ছিল। কোনো কিছু ভালো লাগছিল না। মেজাজ হয়ে উঠল খিটখিটে। কোথায় যেন কী নেই। মনটাকে সব সময় চাঙা রাখার চেষ্টা করতাম, কিন্তু কোনোভাবেই আগের মতো প্রাণ ফিরে পেতাম না। তাই আঁকাআঁকি শুরু করলাম। তখনই একটা ভাবনা চলে এল। গ্রামে অনেক অসহায় মানুষ আছে। তাদের অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তবু তিন বেলা খেতে পাচ্ছি। অনেকেই না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও কবি হিসেবে সিঙ্গাপুর আমাকে পরিচিতি এনে দিয়েছে। সেই পরিচিতির ফলে আমার আঁকা ও লেখা বই মি মাইগ্রেন্ট ব্রেকিং লাইফ একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলে বিক্রি করতে শুরু করলাম। সবার সহযোগিতায় হতদরিদ্র বেশ কিছু পরিবারকে সহযোগিতা করলাম। সিঙ্গাপুরে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করলাম কিছুদিন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজকাল আমার কাছে সবকিছু বিরক্তিকর মনে হয়। সিঙ্গাপুর থেকে বস বলেন, ‘তোমাকে কবে নিয়ে আসব, কবে তুমি আসবে, সে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না!’ কথাগুলো শুনলে মনের ভেতর হতাশা কাজ করে। প্রত্যেক প্রবাসীর একটা লক্ষ্য থাকে, একটা চিন্তা, একটা পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু আমার জীবনের সব পরিকল্পনা, আশা ও স্বপ্ন নিমেষেই ধ্বংস করে দিল করোনাভাইরাস নামের মহামারি। অনিশ্চিত জীবনযাপন যে কত যন্ত্রণার, কত কষ্টের তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজকাল বিছানায় শুয়ে থাকতে ভালো লাগে না। লিখতে, গান শুনতে ভালো লাগে না। মনের ভেতর একটাই ভাবনা বারবার তাড়া করে, কবে আবার সিঙ্গাপুরে যাব! কবে আবার মেরিনা বে বুকিশ কিংবা ওল্ড পার্লামেন্ট হাউসে কবিতার আড্ডায় মেতে উঠব প্রবাসী ভাইয়েরা মিলে! কবে আবার সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব, কবে রোববার হবে—বন্ধুবান্ধব মিলে রান্নাবান্না করে তৃপ্তি নিয়ে খাব! কবে আবার মা–বাবার মুখে হাসি ফোটাব! কবে মা-বাবাকে সহযোগিতা করব! কবে আবার মাস শেষে বেতন পাব! নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করব! এসব প্রশ্ন বারবার আমাকে আঘাত করে। প্রশ্নের উত্তর মেলে না। হতাশার ক্যানভাসে ভেসে ওঠে কষ্টের প্রতিচ্ছবি। কবে মুক্তি মিলবে এই করোনাভাইরাস নামের মহামারি থেকে, সেই অপেক্ষায় আমার মন ব্যাকুল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন