আইনে শুরু সাংবাদিকতায় শেষ

বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবার হিসেবে মৃদুলার মা–বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে চিকিৎসক কিংবা আইনজীবী হোক। পরিবারের পছন্দের পথেই হেঁটেছিলেন মৃদুলা। তবে কিছুদিন পর বিষয়টি তাঁর আর ভালো লাগেনি। ক্যামেরা-কলমে নিজেকে খুঁজে পেতে চাইলেন তিনি। তাই ২০১৪ সালে সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও গণমাধ্যম বিষয়ে ভর্তি হন মৃদুলা।

আইনের ছাত্রী হিসেবে ২০১৬ সালে রোহিঙ্গাদের ফৌজদারি মামলা নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন মৃদুলা। এই পড়াশোনা করতে করতে রোহিঙ্গাদের জীবন তাঁকে নাড়া দেয়। পড়াশোনার অংশ হিসেবেই মিয়ানমারে যান। তার আগে সঞ্চয়ের প্রায় পাঁচ হাজার ডলার দিয়ে একটা ক্যামেরাও কিনে ফেলেন মৃদুলা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শুরু হয় মৃদুলার সাংবাদিকতা জীবন।

default-image

এবিসির সাংবাদিক

২০১৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন মৃদুলা আমিন। এর আগেই সাংবাদিকতার পোকা মাথায় ঢুকে গেছে। কিন্তু পরিবার চায়নি সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার গড়ুক মেয়ে। তাই আইনজীবী হিসেবেই নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে কাজ শুরু করেন মৃদুলা।

পাশাপাশি খণ্ডকালীন সাংবাদিকতাও চলতে থাকে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা ও ছবি। ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত আলোচিত সেই প্রতিবেদনটি তাঁকে আরও উৎসাহ জোগাল। এক সময় বুঝতে পারলেন, তাঁর নিয়তি আসলে সাংবাদিকতা।

২০১৯ সালে যোগ দিলেন অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজে। সংবাদ মাধ্যমটির নিউ সাউথ ওয়েলস দলের সদস্য এবং ওয়েস্টার্ন সিডনি ব্যুরোর প্রতিবেদক। তবে বর্তমানে এক বছরের ছুটিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের গুগল নিউজ ল্যাবসের ফেলো শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। মৃদুলা বলেন, ‘ডিজিটাল মাধ্যমই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই গুগল নিউজ ল্যাবে উদ্ভাবনী ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করা শেখানো হবে। আমি দুই দেশের সাংবাদিকদের তা শেখাব।’

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রচ্ছদে মৃদুলার ছবি

সৈকতে মাকে জাপটে ধরে আছে এক কিশোরী। মেয়েটার দুচোখ বন্ধ। তাঁর অবয়বে পরম নির্ভরতা আর নিশ্চয়তার ছায়া। নতুন জীবনের সন্ধান পাওয়া কোনো সন্তান তাঁর মায়ের বুকে যেমনভাবে মাথা রাখে ঠিক তেমন।

ছবিটি বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক–এর ইন্দোনেশিয়া সংস্করণের প্রচ্ছদ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল ২০২১ সালের গোড়ায়। ছবিটির কারিগর মৃদুলা আমিন।

সিডনি সৈকতে দাঁড়ানো মানুষ দুজন হলেন ৩২ বছর বয়সী মা সাজেদা বাহাদুর মিয়া আর তাঁর ১৬ বছর বয়সী বড় মেয়ে আসমা। তাঁরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০১৩ সালে তিন মাসের এক শ্বাসরুদ্ধকর সমুদ্রযাত্রায় স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে পৌঁছান অস্ট্রেলিয়া। মৃদুলার তোলা ছবি আর লেখায় এই পরিবারসহ শরণার্থীদের করুণ গল্প উঠে এসেছে।

দ্য হিডেন পার্ক অব লাস্ট রিসোর্ট

সিডনিতে কাভার্ড ভ্যানের মধ্যে ঘর বানিয়ে বাস করে কিছু মানুষ। ক্যারাভান পার্কে গিয়ে প্রায় চার মাস ধরে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে ঘুরেছেন। এরপর তৈরি করেছেন প্রায় ৪৫ মিনিটের এক প্রামাণ্যচিত্র দ্য হিডেন পার্ক অব লাস্ট রিসোর্ট। ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল এবিসি নিউজে সম্প্রচার হয় মৃদুলার প্রামাণ্যচিত্রটি। মৃদুলা বলছিলেন, ‘আমার কাজ হলো মানুষের সেসব সম্পর্কের গল্প খোঁজা, যা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ তুলে ধরে, অভিবাসন কিংবা পরিচয়হীনতার মতো গভীর বিষয়গুলোকে জাগিয়ে তোলে।’

মৃদুলা গত বছর যে বর্ষসেরা তরুণ সাংবাদিকসহ তিনটি পুরস্কার পেয়েছেন, তা এই প্রতিবেদনের জন্যই। তবে পুরস্কার নিয়ে উচ্ছ্বসিত নন এই তরুণ সাংবাদিক। যা তাঁর কথাতেই ধরা দিল, ‘অনেকেই আমাকে বলছে, বাহ, তুমি ওয়াকলি অ্যাওয়ার্ডস জয়ী। তবে আমার কাছে পুরস্কার নয়, বরং কাজের স্বীকৃতি পাওয়া মূল্যবান। অবশ্য পুরস্কারটি আমার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।’

মৃদুলার বাংলাদেশ

১৯৯১ সালে অভিবাসী হয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যান মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল হক। তাঁর বাড়ি খুলনায় হলেও পরিবার থাকত ঢাকায়। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় মৃদুলার জন্ম। প্রায় এক বছর পর মা ফারহানা হকের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন তিনি। তিন বোনের মধ্যে মেজ মৃদুলা আমিন।

মৃদুলার স্কুলজীবন শুরু সিডনির হর্নসবি সাউথ পাবলিক স্কুলে। সিলেকটিভ স্কুল অব গসফোর্ডে দ্বাদশ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

ভিনদেশে শৈশব কাটলে কী হবে, পরিবারেই পেয়েছেন বাংলা ভাষা চর্চার সুযোগ। তাঁর কর্ম আর গল্পে রাখেন বাংলা ভাষা আর একজন গর্বিত বাংলাদেশি হওয়ার ছাপ। এমনকি, তাঁর আজকের এ অবস্থানের জন্য বাংলাদেশি হওয়া এবং বাংলা ভাষা জানাকেই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেন মৃদুলা।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন