বিজ্ঞাপন

বিস্তৃতি বাড়তে থাকল। আমরা খিচুড়ি রান্নার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেটুকু রান্না হতো, প্রতিদিন নতুন নতুন মেহমান যুক্ত হওয়ায় খাবারের সংকট হতো। মেহমানেরা অর্ধেক খেয়ে পাশের জনকে খাবারের থালাটা এগিয়ে দিতেন। খাবার শেষ আবার রান্না করতে হতো। চাকরি হারানো বাবা সন্তানের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে আসতেন। হাঁড়ির শেষ খাবারটুকু মুছে নিয়ে যেতেন কোনো মা। আমরা তত দিনে জেনে গেছি, ক্ষুধার রাজ্যে এক বেলা খাবার মানেই ঈদের আনন্দ।

বেশিসংখ্যক মানুষকে খাওয়াতে পারতাম না। সামর্থ্য ছিল সীমিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, সিলিন্ডারে গ্যাস কেনার অর্থ থাকত না। এগিয়ে আসতেন এলাকার মানুষ। কারও বাসার পুরোনো আসবাব ভেঙে দিয়ে যেতেন রান্নার জন্য। বাসার নিচে সেসব দিয়ে রান্না হতো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা ব্যয় সংকোচন করতে দিনের পর দিন শুধুই ডাল-ভাত খেত। সপ্তাহে একদিন গরুর ছাঁট মাংস (গরুর চামড়ার সঙ্গে যুক্ত মাংস, মাথার মাংস) কিনে এনে খেত। রায়েরবাজার থেকে লকডাউনে মাথায় করে বাজার এনেছে। একটা আলাদা রিকশা নিলে খরচ বেশি হবে বলে মেয়েরা মালামাল নিয়ে ভ্যানের ওপর চড়ে বসেছে। শহরের কোথায় সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়, তার জন্য ছুটেছে।

এর মধ্যেই গত বছর রমজান মাস এল। ইফতারির আয়োজন করলাম আমরা। শুরুর কয়েক দিন চার হাজার টাকায় ইফতার আয়োজন হতো। এরপর মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকল। আমাদের সহযোগিতাও করতে থাকলেন অনেকে। সেই সহযোগিতায় রোজ কয়েক শ মানুষ ইফতারের সুযোগ পেল।

করোনা সংক্রমণ কমলে, মানুষ যখন কাজে বেরিয়ে পড়ল তখন মেহমানখানার কাজও সীমিত হলো। তবে প্রতি শুক্রবার আমরা খাবারের আয়োজন করতাম।

default-image

এবার যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছিল দেশ, সরকার লকডাউন ঘোষণা করল, তখন আবার পুরোদমে কাজ শুরু করল মেহমানখানা। এরই মধ্যে এল পবিত্র রমজান মাস। রমজান মাসজুড়ে রোজ হাজারখানেক মানুষ মেহমানখানায় ইফতারের সুযোগ পেয়েছে।

মেহমানখানার গল্প সংবাদমাধ্যমে প্রচারের পর অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে বড় বড় অনুদান নিয়ে এগিয়ে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। কারণ, আমরা আমাদের সংকট, সীমাবদ্ধতাকে সব সময় মনে রাখতে চাই। আমাদের সংকটগুলো সবাইকে নিয়ে মোকাবিলা করতে চেয়েছি বারবার। আর তাই অল্প অল্প করে চাল, আলু, পেঁয়াজ, চিনি, তেল, লবণ, খেজুর জমা করে দিন শেষে বড় সংগ্রহে হাজার মানুষের মেহমানদারি হতো।

আমরা যারা স্বেচ্ছাসেবক, ঢাকায় আমাদের কারও বাড়ি নেই, অনেকে শিক্ষার্থী, অনেকে চাকরিজীবী, কিন্তু চাকরিজীবীদের কারও বেতন ছয় অঙ্কেরও নয়। আমাদের পারিবারিক অবস্থাও কারও এমন কিছু নয় যে আমরা দিনের পর দিন এ আয়োজন চালু রাখতে পারবে। অসংখ্য মানুষ দায়িত্ব নিয়েছেন আর তাই মেহমানখানা চলছে। হাজার মানুষ আসেন, খাবার খেয়ে যান। মেহমানখানার সত্যিকারের নায়ক নাম না প্রকাশের পেছনের এ মানুষেরা।

আমি আর আসমা আক্তার শুরুটা করলেও, এত এত স্বেচ্ছাসেবক আর পরিচিত-অপরিচিত মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা ‘মেহমানখানা’ আমাদের দুজনের, এটা দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। বরং তা ‘আমাদের মেহমানখানা’। দেশের নানা প্রান্তের তরুণেরা এমনটাই বলেন, ‘আমাদের মেহমানখানা’। এটাই আমাদের সার্থকতা।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন