সাজ্জাদ হোসেন
সাজ্জাদ হোসেনসংগৃহীত

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রকাশিত এশিয়ার ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ (থার্টি আন্ডার থার্টি) ২০২১’ তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের নাগরিক সাজ্জাদ হোসেন (২৭)। তিনি বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর প্রতিষ্ঠান এসডিআই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। স্কুলজীবন থেকেই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের ইংরেজি ভাষা শেখান। করোনাকালেও তিনি উদ্যোগী হয়েছেন অভিবাসী শ্রমিকদের সহযোগিতায়। ফোর্বস বলছে, এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তালিকার সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট বিভাগে জায়গা পেয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন।

‘ফোর্বস’ আজ মঙ্গলবার ১০টি শ্রেণিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মোট ৩০০ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অনলাইনে আড়াই হাজার মনোনয়ন থেকে তাঁদের গবেষকেরা এশিয়ার ৩০০ জন নাগরিকের নাম বের করেছেন, যাঁরা তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আর যে ১০টি শ্রেণিতে ‘ফোর্বস’ নাম তুলে ধরেছে তার মধ্যে রয়েছে শিল্পকলা, বিনোদন, আর্থিক খাত, বিপণন ও বিজ্ঞাপন, খুচরা বিক্রি ও ই-কমার্স, প্রযুক্তি, উৎপাদন, স্বাস্থ্য প্রভৃতি। এর মধ্যে তিনটি বিভাগে ৯ জন বাংলাদেশি তরুণের নামও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আজ ২০ এপ্রিল কথা হয় সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথম আলোকে ফোর্বসে স্থান পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে সাজ্জাদ বলেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই ফোর্বসের তালিকাটা দেখলাম। নিজের নাম দেখে সত্যি রোমাঞ্চিত বোধ করছি। কাজের স্বীকৃতি পেতে কার না ভালো লাগে।’

তিনি জানালেন, গত বছর করোনার কারণে সিঙ্গাপুরে লকডাউন ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকেরা ঘরবন্দী হয়ে পড়েন। অনেকে মানবেতর জীবন কাটাতে থাকেন। এ সময় ইংরেজি শেখানোর কাজটি যেহেতু বন্ধ হয়ে যায়, এগিয়ে আসেন মানবিক কাজে। প্রায় ৪৩ হাজার শ্রমিকের কাছে খাবারসহ নিত্যপণ্য পৌঁছে দেন। অনেক অভিবাসী দেশে অর্থ পাঠাতে পারছিলেন না, সাজ্জাদ সে কাজেও এগিয়ে আসেন।

সাজ্জাদ বলেন, ‘বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সহযোগিতা করতে আমরা এসডিআই নামে অ্যাপ চালু করেছি। এই অ্যাপের মাধ্যমে ইংরেজি শেখার পাশাপাশি নানা বিষয়ে তাঁরা উপকৃত হচ্ছেন।’

২৭ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেন সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে তড়িৎ প্রকৌশলে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। পড়াশোনার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছেন তাঁর ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এসডিআই) একাডেমি’ নামে সামাজিক উদ্যোগটির কাজ।

default-image

‘মি. ইংলিশ’ সাজ্জাদের কথা

২০০৫ সালে সাজ্জাদ হোসেন ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সবে পা রেখেছেন। ক্লাস শুরুর আগেই সিঙ্গাপুরের বিমানে উঠতে হলো। তাঁর প্রকৌশলী বাবা মো. শহীদুল্লাহ আগে থেকেই সিঙ্গাপুরপ্রবাসী। তিনি সেখানে একটি জাহাজ তৈরির কারখানায় তড়িৎ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। মা ফেরদৌস জাহানের সঙ্গে সে বছর গেলেন সাজ্জাদ ও তাঁর ছোট বোন নাজমুন নাহার।

সিঙ্গাপুরে গিয়ে সাজ্জাদকে স্কুলে ভর্তির চেষ্টা করা হলো। কিন্তু কোনো স্কুলেই ভর্তির সুযোগ পেলেন না। ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি না পারার কারণে অকৃতকার্য হলেন। তাঁর বাবা ভাবলেন, পড়াশোনা তো চালিয়ে নিতে হবে। তাই স্কুলপ্রধানকে অনুরোধ করে সাজ্জাদকে ইউহুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হলো।

default-image

দুই শ্রেণি নিচে ভর্তি হওয়া মানে দুটি বছর হারানো। এ নিয়ে মনঃকষ্ট ছিল সাজ্জাদের ভেতরে। তবে দমে যাননি। সাজ্জাদ বলেন, ‘বন্ধু আর শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমি কয়েক মাসের মধ্যেই ইংরেজিতে ভালো করতে থাকি।’ আর বছর ঘুরতেই তিনি উতরে গেলেন ইংরেজি বৈতরণি।

চলতি পথে কিংবা বিপণিবিতানে হরহামেশাই বাংলাদেশি মানুষের দেখা পেতেন সাজ্জাদ। তাঁদের অনেকেই ছিলেন সে দেশে অভিবাসী শ্রমিক। বাবার কাজের সুবাদেও সাজ্জাদের পরিচয় হতো দেশের অনেক শ্রমিকের সঙ্গে। অনেকের সঙ্গে ভালো খাতিরও হয় তাঁর। তাই মাঝেমধ্যে যেতেন ডরমিটরিতে। এই ডরমিটরিতে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। সেখানে ধীরে ধীরে পরিচয়ের ব্যাপ্তি বাড়ে। সাজ্জাদ বলেন, ‘আমি দেখতাম তারা ভালো ইংরেজি জানে না। নিজেদের মনের কথা, চাওয়া বুঝিয়ে বলতে পারত না। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের কাছে গেছে, কিন্তু নিজের অসুস্থতার কথা বুঝিয়ে বলতে পারছে না।’ এমন চিত্র প্রতিনিয়ত দেখতেন সাজ্জাদ। তাঁর মনে ভীষণ দাগ কাটে ব্যাপারটা। ভাষা দুর্বলতার জন্য নিজের ভেতর চাপা কষ্ট তো ছিলই। তাই এই অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য কিছু করার চিন্তা ঢুকে যায় তাঁর মাথায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

সেই চিন্তা থেকেই সাজ্জাদ তাঁর বাসার কাছেই তামান জারং গ্রিন পার্কে ইংরেজি শেখাতে শুরু করেন। জনা দশেক ছাত্র নিয়েই তাঁর উন্মুক্ত ক্লাস চলে কিছুদিন। এরপর তাঁর শেখানোর ধরনে নতুনত্ব আনেন, তৈরি করেন সিলেবাস। দাঁড়িয়ে যায় শেখানোর কাঠামো।

দিনে দিনে তাঁর ক্লাসে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে যান সাজ্জাদ। পেয়ে যান কয়েকজন সহযোগীও। এই দলটি নিয়েই ২০১৩ সালে সাজ্জাদ গড়ে তুললেন এসডিআই একাডেমি।

২০১৪ সালে সাজ্জাদ তাঁর ইংরেজি ভাষা শেখানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ করলেন বই—‘ড. ইংলিশ’। বেশ জনপ্রিয় হলো বইটি। পরিচিতি বাড়ল। সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবসে পেলেন সে দেশের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ। সেখানে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী প্রশংসাও করেছেন তাঁর। তখন সাজ্জাদের উদ্যোগ নিয়ে খবর প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’ ও ‘চ্যানেল নিউজ এশিয়া’।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন