default-image

দুঃসময়ে অনেকেই যখন দায়িত্ব এড়িয়ে যান, মশিউর রহমানেরা তখন জীবন বাজি রাখেন। স্বেচ্ছায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। মশিউর রহমান তরুণ চিকিৎসক। গত বছর কোভিড–১৯ সংক্রমণের শুরুতে চারদিকে যখন ভয়, উৎকণ্ঠা আর অসহায়ত্বের চিত্র, তখনই করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে সিরাজগঞ্জ থেকে স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা কোভিড হাসপাতালে।

ছেলেবেলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে বড় হয়েছেন মশিউর রহমান। বুকে আশা পুষে রেখেছিলেন দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধে যাওয়ার। কোভিড-১৯ যেন তাঁকে সে সুযোগই করে দেয়। মশিউর বলেন, ‘আমার মা অসমসাহসী একজন নারী। তিনি এই সাহস পেয়েছিলেন আমার নানা বীর উত্তম সুবেদার হাবিবুর রহমানের কাছে। ছেলেবেলা থেকেই মা ও নানার মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে বড় হয়েছি। তখন ভাবতাম, সুযোগ পেলে আমিও নানার মতো দেশের প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখব। কোভিডের শুরুর সময়টাকে তেমনি এক সুযোগ বলে ভেবেছিলাম।’

বিজ্ঞাপন
default-image

৩৯তম বিসিএসে নিয়োগ পেয়ে ২০১৯ সালের শেষ দিকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন মশিউর। তখন থেকেই দেশ–বিদেশের গণমাধ্যমে সার্স করোনা–২ ভাইরাসের কথা জানতে পারেন। ভাইরাসটি সম্পর্কে জানতে ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই অনলাইনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেন। পড়তে শুরু করেন স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল। দেশে কোভিড রোগী শনাক্তের আগেই করোনাভাইরাস এবং এর চিকিৎসাপদ্ধতি জেনে নেন মশিউর।

মশিউর রহমান বলে যান, ‘কোভিড মোকাবিলায় প্রতি জেলা থেকে ১০ জন চিকিৎসক নিয়ে দল তৈরি করছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ভাইরাসটি সম্পর্কে আমার জানাশোনা থাকায় সে দলে আমাকেও যুক্ত করা হয়। সরকারিভাবে আরও বেশি জানাশোনার সুযোগ তৈরি হয়। আমি তখন কোভিডের চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত।’ কিন্তু তখনো সিরাজগঞ্জে কোভিড–আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। অন্যদিকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অসংখ্য রোগী। প্রতিদিন গণমাধ্যমে দেখেন, রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না, স্বজনেরা রোগীদের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। অপরিচিত রোগ এবং মৃত্যুঝুঁকি থাকায় কোনো কোনো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছেন। এসব দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন নারায়ণগঞ্জ আসার।

কোভিড হাসপাতালে বদলির অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ১৫ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুটি চিঠি লিখলেন মশিউর। অনুমতি পেয়ে ২৭ এপ্রিল যোগ দেন নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা কোভিড হাসপাতালে।

মশিউর বলেন, ‘সে সময়টায় খাবার আর টাকার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সাহস ও ভালোবাসার। দেশের জনগণের টাকায় আমার বেতন–বোনাস হয়। জনগণের টাকায় নামমাত্র খরচে মেডিকেল কলেজে পড়েছি। দেশের প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে গেলে অধর্ম হতো।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিক্ষক বজলুর রহমান ও গৃহিণী শিরিনা আক্তারের চার ছেলে–মেয়ের মধ্যে মশিউর দ্বিতীয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও রাজধানীর নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে এমবিবিএস পড়েছেন খুলনা মেডিকেল কলেজে।

সহকর্মী ও বন্ধুদের কাছে সজ্জন মশিউর খুলনা মেডিকেল কলেজে থাকতে এম বি জামান নামে খুলনার একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তিন বছর বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প করে বেড়িয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক আবুল বাশারের চোখে পরিশ্রমী ও মেধাবী তরুণ এক চিকিৎসক মশিউর রহমান। নারায়ণগঞ্জের কোভিড হাসপাতালে যোগদানের পর এক দিনের জন্যও ছুটি কাটাননি তিনি। তাই তো রোগীদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে।

লেখক: প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা

বিজ্ঞাপন
প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন