default-image

বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস তাদের ৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ তালিকায় নির্বাচিতদের মিলনমেলার আয়োজন করেছিল সিঙ্গাপুরে। সেটা ২০১৬ সাল। অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড তথা বিভিন্ন দেশের বিজয়ীরা দলভুক্ত হয়ে আড্ডায় মেতে উঠেছেন। এর মধ্যে একা একজন এক পাশে বসে আছেন। কারণ, সেই অনুষ্ঠানে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি। পরে অবশ্য ফিলিপিনো বিজয়ীরা তাঁকে ডেকে নেন। দলভুক্ত করেন। ওসামা বিন নূরের সেই স্মৃতি এখনো অটুট। কিছুটা দুঃখমাখা স্মৃতি বলেই হয়তো!

ফোর্বস–এর এশিয়ার ৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ তালিকায় প্রথম বাংলাদেশি তরুণ ওসামা। তিনি ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের হাত থেকে গ্রহণ করেছেন কুইন’স ইয়াং লিডার্স পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ওসামা হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, লুঙ্গি-পাঞ্জাবি আর কাঁধে ছিল গামছা। পুরস্কার নেওয়ার সেই ছবিটি ছাপা হয় গণমাধ্যমে। ওসামা ও তাঁর কাজ সম্পর্কে জানা যায় তখন।

বিজ্ঞাপন
default-image

গাজীপুরের তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় পড়ার সময় থেকে নানা রকম স্বেচ্ছাসেবী কাজের সঙ্গে যুক্ত হন ওসামা। এ সময় তিনি প্রথম অনুভব করেন, সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে না পারায় অনেক সুযোগই হাতছাড়া হয়ে যায় দেশের তরুণদের। ভাবতে শুরু করেন, কী করে সুযোগের খবরটা পৌঁছে দেওয়া যায়।

তত দিনে মাদ্রাসার পাট চুকিয়ে একটি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ২০১১-১২ সালের দিকে ফেসবুক ঘিরে তরুণদের আগ্রহ আর দেশে ইন্টারনেটের প্রসার বাড়তে শুরু করেছে। এ সময় নেতৃত্ববিষয়ক একটি প্রশিক্ষণে পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) ছাত্র মাকসুদুল মানিকের সঙ্গে। দুজন একসঙ্গে নানা স্বেচ্ছাসেবী কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই দুজন ২০১০ সালে প্রথমে একটা ফেসবুক পেজ চালু করেন ওসামা-ইয়ুথ অপরচুনিটিস নামে! সেখানে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক বৃত্তি, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও তরুণদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার তথ্য দেওয়া শুরু করে। ধীরে ধীরে পেজের খবর পৌঁছে যায় নানা জায়গায়।

সে বছরই ভারতের চেন্নাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক যুব কংগ্রেসে যোগ দেন ওসামা। তৈরি হয় অনেক বৈশ্বিক বন্ধু। তাঁদের কাছে নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে জানান। দেখা গেল, অনেকেই তাঁর এ উদ্যোগে শরিক হতে চাইল নিজ নিজ দেশের সুযোগ–সুবিধার খবর নিয়ে। তাঁদের অংশগ্রহণে ওসামাদের পেজ একটি বৈশ্বিক পেজ হতে শুরু করে। পেজে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হলে অনেকেই ইনবক্সে সেটির বিস্তারিত জানতে চাইতেন। ওসামারা সেগুলোর উত্তর দিতে শুরু করেন। একসময় দিনে শতাধিক মেসেজের জবাব দিতে হচ্ছিল।

একসময় বোঝা গেল, একটি ওয়েবসাইট করতে পারলে ভালো হয়। ‘কিন্তু আমাদের কারোরই ওয়েবসাইটের প্রযুক্তি নিয়ে তেমন একটা ধারণা ছিল না।’ বলেন ওসামা। তাই আশরাফুল আমিনের সহায়তা নিয়ে ২০১৪ সালে চালু হলো ইয়ুথঅপ ডটকম কম নামের ওয়েবসাইট। দেখা গেল, ওয়েবসাইট থেকে তরুণদের সহায়তা করার কাজটি অনেক সহজ হয়ে গেল।

কাজে মনোযোগ দেওয়া হলো তথ্যের ব্যাপ্তি, বৃত্তি, ফেলোশিপের নানা খবর সংগ্রহের জন্য। প্রায় তিন হাজার প্রতিষ্ঠান তাদের সুযোগগুলো ইয়ুথ অপরচুনিটিসের মাধ্যমে প্রচার করেছে এবং এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান চুক্তিবদ্ধ আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যেকোনো সুযোগের কথা ওসামাদের জানায় যেন সেটি প্রকাশিত হয় তাঁদের পোর্টালে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ইংরেজি ও বাংলায় তথ্য থাকে পোর্টালটিতে। প্রায় ২০০টি দেশের তরুণেরা এটি ব্যবহার করছেন নিয়মিত। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কারওয়ান বাজারের জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ইয়ুথ অপরচুনিটিসকে ৩০০ বর্গফুটের অফিস বরাদ্দ করে। সেখানেই তাঁদের কার্যালয়। বর্তমানে ইয়ুথ অপরচুনিটিসে দেশে ৩০ জন ও দেশের বাইরে ১০ জন কাজ করছেন। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইয়ুথ অপরচুনিটিসের ক্যাম্পাস দূতরা কাজ করছেন। শুধু তথ্যসেবা নয়, ইয়ুথ অপরচুনিটিস এখন নিজেদের সেবাকে সম্প্রসারিত করছে নানা বিষয়ে তরুণদের মনোভাব জানার নানা গবেষণায়ও। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় তরুণদের নিয়ে সম্মেলন, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা আয়োজনও করা হচ্ছে। এসবে ব্রাজিল, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, ঘানা, ইরান, পর্তুগাল, মালয়েশিয়া, আজারবাইজানসহ নানা দেশের তরুণেরা অংশ নিয়েছে।

ওসামা জানালেন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা, ‘এখন ইয়ুথ অপরচুনিটিস কাজ করছে স্কুলজীবন থেকে শুরু করে তরুণ পেশাজীবী পর্যন্ত দক্ষতা, শিক্ষা, ক্যারিয়ারবিষয়ক সেবা দিতে। একজন তরুণ গ্রাহক শুধু সুযোগের তথ্যই পাবে না, সে সুযোগগুলো কাজে লাগানোর উপায়ও জানবে।’

ওসামা ২০১৭ সালে যয়নব সৈয়দ আহমেদকে বিয়ে করেন। মেয়ে ইউসরা ওসামা নূরসহ ঢাকায় থাকেন। দিনের শুরুটা কাটে দন্ত চিকিৎসায়, তাঁর চেম্বারে—বাকি তরুণদের জন্য।

লেখক: প্রথম আলোর যুব কর্মসূচি ও ইভেন্টের প্রধান

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন