পাওমুম থারক্লার খুদে পড়ুয়াদের ম্রো বর্ণমালা শেখানো হয়
পাওমুম থারক্লার খুদে পড়ুয়াদের ম্রো বর্ণমালা শেখানো হয় সজীব মিয়া

পাওমুম থারক্লা অর্থ কী?

‘নতুন কুঁড়ি’।

বাঁশের সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে ম্রো ভাষার শব্দটির অর্থ শুনি মেনরুং ম্রোর কাছে। তিনি পাওমুম থারক্লা নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালক। ম্রো শিশুদের আবাসিক বিদ্যালয়টি চালুর সঙ্গে তরুণ মেনরুংয়ের এক ঝড়ের রাতের গল্প জড়িয়ে আছে। সে গল্প একটু পরে বলি। তার আগে যাওয়া যাক পাওমুম থারক্লায়।

সাঁকোর নিচে মৃদু স্রোতে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের যে খাল, নাম তার ফাদু। কয়েক কদম সামনে খালের পেটে প্রবেশ করেছে একটি ছড়া, তার নাম ফাইন। খাল আর ছড়ার মিলন যেখানে, সেখান থেকেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয়। সে পাহাড়ের গোড়ায় বাঁশ-কাঠ আর টিনের আটপৌরে বিদ্যালয়টি। শ্রেণিকক্ষ ছাড়া আর একটি কক্ষ আছে বিদ্যালয়ে, সেটা দপ্তর। স্কুলঘরের কিছুটা নিচে রান্নাঘরসমেত যে মাচাং, সেখানে আবাসিক শিশুদের থাকার ব্যবস্থা।

বেসরকারি বিদ্যালয়টির অবস্থান বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নে। বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি পাড়া থেকে আসা ৩৫ জনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে এখানে। এই শিশুরাসহ আশপাশের ৫টি ম্রো পাড়ার ৮৫ জন শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায় পাওমুম থারক্লায়। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ম্রো সম্প্রদায়ের। আবাসিক শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব পাড়াবাসীর। তবে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা, পরিচালনাসহ সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে কয়েকজন বাঙালি তরুণ। এই তরুণদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রেই ২০ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি কাটিয়েছি পাওমুম থারক্লার খুদে পড়ুয়াদের সঙ্গে।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে মেনরুং ম্রোর সঙ্গে আলাপের সময় বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশ শুরু হয়েছিল। শান্ত পাহাড়ে সারিবদ্ধ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে প্রাণ পায় জাতীয় সংগীত। এরও আগে শিক্ষার্থীরা প্রভাতফেরিতে অংশ নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মমতায় গড়া কাঠের শহীদ মিনারে পাহাড় থেকে আনা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।

default-image
বিজ্ঞাপন

এক ঝড়ের রাত

মেনরুং ম্রো যখন কথা বলছিলেন, তখন পাশে এসে দাঁড়ালেন শাহরিয়ার পারভেজ। তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তরুণ শাহরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ। সেই রোমাঞ্চের টানেই পাহাড়ে ঘোরাঘুরি, পাহাড়ি মানুষের সঙ্গে আন্তরিকতা।

শাহরিয়ার বললেন, ‘মেনরুং তখন অন্য একটি বিদ্যালয়ে পড়াতেন। এক রাতে বাড়ি ফেরার সময় ঝড়ে এই ম্রো পাড়ায় আটকে পড়েন। কারবারির বাড়িতে আশ্রয় নেন। কারবারি ছংকক ম্রোর কাছেই শোনেন আশপাশের পাড়ায় কোনো বিদ্যালয় নেই, এখানকার শিশুরা পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিতই।’

মেনরুংয়ের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল শাহরিয়ার পারভেজদের। পাহাড়ে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা স্বেচ্ছায় কাজ করেন। সেই পরিচয়ের সূত্র মেনরুং জানান বিষয়টি। এরপর শিক্ষা উপকরণ নিয়ে শাহরিয়াররা হাজির হন ছংকক ম্রোর বাড়িতে। সেখানেই পাড়ার শিশুদের নিয়ে সান্ধ্য ক্লাস শুরু করেন। এগিয়ে চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজও। কারবারি ছংকক ম্রো একটি পাহাড় দেন স্কুলের জন্য। পাড়াবাসী এগিয়ে আসেন বাঁশ, কাঠ নিয়ে, দেন স্বেচ্ছাশ্রম। ২০১৭ সালে চালু হয় পাওমুম থারক্লা।

default-image

শাহরিয়ার বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ম্রো সম্প্রদায়ের সন্তানদের জন্য। তাঁদের ভাষায় পড়ানো হয়। সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, গণিত। শুরুতে অভিভাবকদের অনেক বোঝাতে হতো, এখন আগ্রহ নিয়ে সন্তানদের ভর্তি করাতে আসেন অনেকেই।’ আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য কিস্তিতে বছরে ৯ হাজার টাকা নেওয়া হয় বিদ্যালয়ে। কারও পরিবার টাকা দিতে না পারলে, চাল, সবজি কিংবা বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু দিতে পারে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় পড়ানো হয়। তাই এ স্কুলে ঝরে পড়া ছাত্রছাত্রীর হার কম।

দুর্গম পাহাড়ে এই বিদ্যালয় ঘিরে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। যারা একসময় বিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বপ্নই দেখত না, তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। মেনরুং ম্রো বলেন, ‘আমাদের পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো এবার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদের কাছে তা অনুপ্রেরণা।’

পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার একেবারে কম। পাওমুম থারক্লা বিদ্যালয়ে যারা পড়ছে, তাদের বেশির ভাগই পরিবারের প্রথম স্কুলপড়ুয়া। তাই পঞ্চম শ্রেণি পাস করার আনন্দকে ‘অনুপ্রেরণা’ বলতেই পারেন মেনরুং ম্রো।

default-image

পাওকদের বাড়ি চিম্বুকের কোলে

শেষ বিকেলে একদল শিক্ষার্থী পাওমুম থারক্লার ছোট মাঠে ফুটবল খেলছিল। কেউ কেউ করছিল গল্প। পাওক, কিংওয়াই, পাংপু, থন লক ম্রোদের পাওয়া গেল শ্রেণিকক্ষের সামনে।

পাওকের সঙ্গে ভাষার দূরত্ব ঘুচল স্নিগ্ধ হাসিতে। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী পাওক বেশ চটপটে। বাংলা অনেকটাই বোঝে, তবে বলতে গিয়ে আটকায়। এক শিক্ষক এগিয়ে এলেন দোভাষীর ভূমিকায়, তাঁর মাধ্যমেই আমাদের কথোপকথন এগোল।

default-image

পাওক তার পরিবারের প্রথম স্কুলপড়ুয়া। ওদের বাড়ি বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের নতুন পাড়ায়। পাওকের বাবা মাংপং ম্রো কৃষিজীবী। স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন স্কুলে। পাওক এখন তাই বুঝতে পারে পাহাড়ি প্রকৃতির বাইরেও আছে আরেক দুনিয়া।

পাওক ম্রোর মতো অন্যদের গল্প প্রায় একই। ভাষার দূরত্ব আর অর্থের অনটন ঘুচিয়ে বড় হতে চায়। আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে বাড়িতে না থাকার কষ্ট গোপন করে তাই হাসে। করোনাকালে অবশ্য দীর্ঘদিন বাড়িতেই ছিল। মাসখানেক আগে বিদ্যালয়ে ফিরেছে ওরা। বিদ্যালয়টির সভাপতি স্থানীয় কারবারি ছংকক ম্রোর কাছে জেনেছি, দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই নিজেদের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাসখানেক আগে চালু করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকেরা ছাত্র

ক্রংচুং ম্রো বেশ পরিপাটি তরুণ। গায়ে ফুটবলার লিওনেল মেসির জার্সি। মোজা পায়ে স্যান্ডেল। ফুটবলার হিসেবে ২০ বছর বয়সী ক্রংচুংয়ের পাড়ায় বেশ নামডাক। লামার এক মিশনারি স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবেন এবার। তাঁর মতো পাওমুম থারক্লার আরও তিনজন শিক্ষক আছেন—কাইংপং ম্রো, মেংকং ম্রো আর মাংয়া ম্রো। সবার জীবনের গল্প কমবেশি একই, পাহাড়ে বেড়ে ওঠা, কষ্টেসৃষ্টে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনো, মাধ্যমিকে উঠতেই বিয়ের তাগাদা ইত্যাদি। যেমন কাইংপং ম্রো উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন এবার। এরপর কী করবেন, তিনি জানেন না। জানেন না পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য। তবে বিদ্যালয়ে অন্য ম্রো শিশুদের পড়াতে পেরে সবাই গর্বিত।

default-image

কাইংপং ম্রো বলছিল, ‘আমরা ভাষাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। এখনো আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধের মুখে। তবু নিজেদের সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই আনন্দের।’

পাওমুম থারক্লা প্রাথমিক বিদ্যালয় আর সেখানকার নতুন কুঁড়িদের নিয়ে এই আনন্দ আসলে ম্রো পাড়ার সবার।

মোদের স্কুল, মোরাই গড়ি

বাঁশ, কাঠ আর ঢেউটিন দিয়ে গড়া পুরোনো বিদ্যালয়টি নতুন করে গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে পাওমুম থারক্লা। শাহরিয়ার পারভেজ বলছিলেন, ‘স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, আলাদা শ্রেণিকক্ষসহ দাপ্তরিক কক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, গ্রন্থাগার প্রয়োজন। এসব বিষয় মাথায় রেখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কয়েকজন শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় আমরা নকশা করে নিয়েছি। স্থানীয় উপকরণে তৈরি হবে বিদ্যালয়।’ এ জন্য ফেসবুকে একটি ইভেন্টও খোলা হয়েছে। বিস্তারিত: https://fb.me/e/3d96Mo6WG
প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন