কোমায় থেকে কর্নেল

মাথাটা টুপ করে হেলে পড়ল। বাড়ি খেল বিছানার ক্রাংক হ্যান্ডেলের (হাসপাতালের বিছানার একাংশ ওপর-নিচ করার হাতল) সঙ্গে। দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তে ফেনায় ভরে উঠল। জ্ঞান হারালেন তিনি।

ঘটনাটা ঘটল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। তিন সন্তানকে নিয়ে কক্ষেই ছিলেন সেনা কর্মকর্তা তাছাওয়ার রাজার স্ত্রী মোসলেহা মনিরা রাজা। স্বামী দিন কয়েক হাসপাতালে থাকছেন জেনে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচে) গিয়েছিলেন তিনি। কেবিনটা গোছাচ্ছিলেন। একবার দেখলেনও, বিছানার পাশেই চেয়ারে তাছাওয়ার রাজা বসে আছেন, ঢুলু ঢুলু ভাব। দিনভর বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে টুকটাক কথাও বলেছেন। তারও মিনিট কয়েক আগে ইসিজি করানো হয়েছে। স্ত্রী ভেবেছিলেন, হয়তো ঘুম পেয়েছে স্বামীর। কিন্তু মুহূর্তেই ঘটল সেই ঘটনাটি। হতচকিত হয়ে চিৎকার করলেন তিনি।

default-image

ভয়ার্ত চিৎকারে ছুটে এলেন নার্স। স্ট্রেচারে তোলা হলো। তাছাওয়ার রাজাকে নেওয়া হলো পাশের ভবনের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ)। অজ্ঞান তাছাওয়ারের কয়েকটা দিন কাটল সেখানেই। হার্ট অ্যাটাকের ধকল সামলে জ্ঞান ফিরলেও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলো। চলে গেলেন কোমায়। এ অসুস্থতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস’। হার্ট অ্যাটাকসহ অন্য কোনো কারণে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ক্ষণিকের জন্য বন্ধ থাকলে অক্সিজেন সরবরাহও বন্ধ হয়। সে সময় টিস্যু মারা যায়। এমন পরিস্থিতিতে শরীরের অন্য অঙ্গ সচল হলেও মস্তিষ্ক অকার্যকর হয়ে যায়।

২০১৩ সালের ১১ মার্চের সন্ধ্যার সেই মুহূর্তের কথা যখন মোসলেহা মনিরা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া কোনো মুহূর্তের বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি। আলাপের শুরুতে তাঁর মুখের একচিলতে যে হাসি লেগে ছিল, দিনটির কথা বলতে গিয়ে তা কর্পূরের মতো উবে গেল। ‘সেদিন থেকে তো হাসতেই ভুলে গিয়েছি। বাসা-সিএমএইচ-বাসা—এই করে আমার দিন কাটতে থাকল। একটা সময় বাচ্চাদের দিকেও তাকাইনি।’ বললেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

অসুস্থতার শুরুতেই বাংলাদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে নেওয়া হয়েছিল তাছাওয়ার রাজাকে। সঙ্গী ছিলেন মনিরা রাজা। তাঁর জন্য সে এক নতুন জীবন। ‘একাই থেকেছি, একাই কেঁদেছি, একাই সব করেছি’—যোগ করেন মনিরা।

বিশেষায়িত সেই হাসপাতালে যখন জানলেন ফিজিওথেরাপি আর পরিচর্যা ছাড়া সেখানে আর কোনো চিকিৎসা নেই, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো দেশে ফিরিয়ে আনার। তিন সপ্তাহ পর দেশে এনে সেই যে সিএমএইচে রাখা হলো তাছাওয়ার রাজাকে, এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন। রোজ সকাল-সন্ধ্যা হাসপাতালে যান মোসলেহা মনিরা। নিজের হাতে রান্না করা খাবার ব্লেন্ড করে খাইয়ে দেন। শুরুর কয়েক বছর নিজেই গোসলসহ সব সামলেছেন। একটা সময় থেকে দুজন সৈনিক দায়িত্ব পালন করছেন পরিচর্যার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি তাই কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাঁর।

default-image

২০ অক্টোবর কথা বলার সময় রাজা দম্পতির বড় ছেলে দেওয়ান মোহাম্মদ মুসাওয়ার রাজা পাশেই ছিলেন। কথাগুলো শুনে মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে বিষাদে ডুবে গেলেন যেন। সদ্য স্নাতক এই তরুণ বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন ভ্রমণের শখ। সেই শখকে তিনি লালন করেন। মোসলেহা মনিরা বললেন, ‘আমাদের ছোট ছেলে দেওয়ান মোহাম্মদ মায়াসসার রাজা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেছে, মেয়ে তাসওয়ারীন ফাতিমা রাজা পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে। ওদের বাবা যখন অসুস্থ হলো, তখন সবাই ছোট।’

কড়া নাড়ছিল পদোন্নতি

তাছাওয়ার রাজা কমিশন পেয়ে ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীনে ইরাক-কুয়েত (১৯৯৫-৯৬) ও সুদানে (২০০৭-০৮) দায়িত্ব পালন করেছেন। পেয়েছেন ‘জাতিসংঘ শান্তি পদক’। চৌকস সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এমন স্বীকৃতির সঙ্গে পেয়েছেন নিয়মমাফিক পদোন্নতিও। ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার তাছাওয়ার রাজা যুক্ত হয়েছিলেন ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস’ প্রকল্পে। প্রকল্পের নামেই বইয়ের গ্রন্থনা ও সহসম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। এসব তথ্য পাওয়া গেল মরমি কবি হাসন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে তাঁর লেখা হাছন রাজা সমগ্র বইয়ের লেখক পরিচিতিতে। তিনি হাছন রাজার প্রপৌত্র। দাদার বাবাকে নিয়ে ছিল তাঁর অপার আগ্রহ। সে আগ্রহের উদ্যোগেই সিলেট নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় হাছন রাজার ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। মনিরা রাজা বলেন, পথেঘাটে কাউকে বাঁশি বাজাতে বা গান গাইতে দেখলেই কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘হাছন রাজার গান পারো?’ গান গাইলেই খুশি হয়ে গায়ককে ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিতেন।

default-image

অসুস্থ হওয়ার আগেও গবেষণার কাজ করছিলেন। সে সময় কর্নেল র‌্যাংক ব্যাজ পাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু জীবন থমকে গিয়ে, থমকে গিয়েছিল পদোন্নতিও। সেই সম্মান তাঁকে দেওয়া হলো ১২ অক্টোবর। তাঁর চাকরিজীবনের শেষ দিনে। মনিরা রাজা বললেন, ‘এভাবে সম্মানিত করা হবে বুঝতে পারিনি। ওর যেটা প্রাপ্য, সেটা পেয়েছে। সত্যি এটা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। সেনাপ্রধানসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’

default-image
বিজ্ঞাপন

আবার ফিরি অসুস্থতায়

দু-চার দিনের ছুটি পেলেই এদিক-সেদিক ঘুরতে যেতেন তাছাওয়ার রাজা। মনিরা রাজা যোগ করেন, ‘অবশ্যই আমাদের সঙ্গে নিয়েই। ভীষণ পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ তো সে’।

২০১৩ সালের মার্চের সে সময়টাতেও ছুটি ছিল, পরিকল্পনা ছিল বরিশালের দিকে ঘুরতে যাওয়ার। কিন্তু যাওয়া হয়নি। ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার, বাসায় ফিরে দিন কয়েক হলো যে পেটব্যথার কথা বলেছিলেন, সেটাই আবার বললেন। রোববার এল। তাছাওয়ার রাজাও প্রাত্যহিক কাজে ডুবে গেলেন, ব্যথার কথা ভুলে গেলেন। বাসায় ফিরে আবার ব্যথা অনুভব করলেন। সোমবার আর দেরি করলেন না, সকালেই গেলেন সিএমএইচে। দুপুরে মনিরা রাজা ফোনকল পেলেন স্বামীর। জানলেন, বেশ কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে আলসারের ওষুধ, দিন কয়েক হাসপাতালে থাকতে হবে।

default-image

তিন সন্তান তখনো স্কুলে। তাদের বাসায় আনা–নেওয়া মোসলেহা মনিরা রাজাই করেন। সবাইকে বাসায় এনে তৈরি হয়ে হাসপাতালে গেলেন সন্ধ্যায়। তখনো স্বভাবসুলভ তাছাওয়ার রাজা। ‘সব সময় ওর মুখে হাসি লেগে থাকত। তাই প্রায়ই তাকে মজা করে বলতাম, আমি তো হাসি না, আমার বোধ হয় হার্ট অ্যাটাক হবে! কিন্তু হলো উল্টোটা।’

বাক্যটা শেষ হতেই মোসলেহা মনিরার চোখ বেয়ে পানি গড়ায়। কণ্ঠ ধরে আসে তাঁর। পায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলি মুখোমুখি বসা আমরা তিনজন। বসার ঘরজুড়ে বিষাদ নেমে আসে।

মন্তব্য পড়ুন 0