খোঁয়াড় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন আবদুল করিম
খোঁয়াড় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন আবদুল করিমছবি: লেখক

গলায় দড়ি পরার অভ্যাস যে ধাতে নেই, ছাগল দুটোর আচরণ তা বুঝিয়ে দিচ্ছিল। সরু সুপারিগাছের সঙ্গে ছোট দড়িতে পাশাপাশি বাঁধা হয়েছে এগুলোকে। সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কাঁঠালপাতা। একসময় দড়ির অস্বস্তি ভুলে কাঁঠালপাতা চিবুতে মনোযোগী হয় ছাগল দুটো।

বিজ্ঞাপন

ছাগল জোড়ার দশা যা-ই হোক, খোঁয়াড় ব্যবস্থাপক আবদুল করিমের মুখে খুশির আমেজ। প্রায় তিন মাস পর তাঁর খোয়াড়ে কোনো প্রাণী এল। ছাগল দুটি স্থানীয় একজনের সবজিখেতে মুখ লাগিয়েছিল, আর যায় কই, চাষি রেগেমেগে মনিবের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে সোজা খোঁয়াড়ে এনেছেন প্রাণী দুটিকে। বিনিময়ে ১০ টাকা পেয়েছেন তিনি।

এসব কথা আমরা ব্যবস্থাপক আবদুল করিমের কাছে শুনি। করোনা আর বন্যার কারণে তাঁর হাতে এখন অফুরন্ত সময়। সময় আছে বলেই বাড়ির সামনে ব্যবসা শুরু করেছেন। খুপরিতে চা-পান বিক্রি করেন। ৫০ বছর বয়সী আবদুল করিম তিন বছর হলো খোঁয়াড়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিলাম হয়। জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ইউনিয়নটার নাম পাররামরামপুর। প্রতিটি ওয়ার্ডে আলাদা খোঁয়াড় বরাদ্দ হয়। আবদুল করিম আগের মেয়াদে ভালো করায় তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর গ্রামের নাম ডিগ্রিরচর। নিলাম জিতেছেন বার্ষিক তিন হাজার টাকায়।

বিজ্ঞাপন

‘প্রতিবছরই লোকসানে থাকি। তবু দায়িত্ব এড়াতে তো পারি না,’ বলেন আবদুল মালেক। তবে খোঁয়াড় থেকে কিছুটা আয়ও যে হয়, তা তাঁর কথা শুনে অবশ্য বোঝা যায়। একটি গরু ছাড়িয়ে নিতে মালিককে দিতে হয় ১০০ টাকা, আর একটি ছাগলে ৩০ টাকা। এ ছাড়াও আছে আরও কিছু আয়ের পথ।

আয়ের যত পথই থাকুক, তা সামান্যই বলা যায়। কারণ, কৃষি ও উৎপাদনব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে এ ব্যবস্থা অনেকটা বিলুপ্তির পথে। গ্রামটির অনেকের সঙ্গে কথা বলেও তারই আঁচ পাওয়া গেল। বেশির ভাগ গ্রামবাসী জানেনই না, গ্রামে একটি খোঁয়াড় আছে। অথচ একসময় সর্বত্র ছিল গ্রামীণ এই ব্যবস্থার চল। যেমন বাংলাপিডিয়া বলছে, মোগল আমলে যখন সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি, তখন জমির ফসল রক্ষার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান বিশেষ গুরুত্ব পায়। সংস্থাটির নিবন্ধে বলা হয়েছে, খোঁয়াড় হচ্ছে জমির ফসল অথবা বসতবাড়ির বাগান বিনষ্টকারী গবাদিপশু আটক রাখার গারদ বিশেষ। ফসল বিনাশ করার আশঙ্কা রয়েছে, এমন অবাধে বিচরণকারী গবাদিপশুও খোঁয়াড়ে আটক রাখার বিধান রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

একসময় গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিদের নিয়ে খোঁয়াড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হতো। খোঁয়াড়ের ব্যবস্থাপক খোঁয়াড়ে আটক গবাদিপশু ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য পশুর মালিককে খবর পাঠাতেন। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের ধার্য করা জরিমানা দিয়ে মালিক তাঁর গবাদিপশু ছাড়িয়ে নিতে পারতেন। এখন চলে ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে।

দেশে হারিয়ে যেতে বসা প্রাচীন সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছেন যাঁরা, আবদুল করিম তাঁদেরই একজন। তিনি হয়তো খোঁয়াড়ের ইতিহাস জানেন না, তবে ব্যবস্থাটা যে প্রাচীন ও ঐতিহ্যের বিষয়, এটুকু ফুটে ওঠে তাঁর কথায়। তাই তো বললেন, ‘লোকসান হলেও যত দিন নিলামে পাব, খয়রাটা (খোঁয়াড়) আমিই চালাব।’

মন্তব্য পড়ুন 0