খুলনার গণহত্যা জাদুঘরে প্লাটিনাম জুবলি জুট মিলসের বয়লারের অংশবিশেষ
খুলনার গণহত্যা জাদুঘরে প্লাটিনাম জুবলি জুট মিলসের বয়লারের অংশবিশেষসাদ্দাম হোসেন

ঘৃণিত মোটরসাইকেল

এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের আসার খবরে বাড়ি ছেড়েছিলেন বাসিন্দারা। যশোরের মনিরামপুরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের কাছেই গিরীন্দ্রনাথ ঘোষের সে বাড়ি ফাঁকা পেয়ে ক্যাম্প গড়ে তুলে স্থানীয় রাজাকাররা। এই ক্যাম্প থেকেই একাত্তরের বিভিন্ন সময়ে রাজাকার বাহিনী যশোরের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালায়। বাড়িটিতে গড়ে তোলে নির্যাতনকেন্দ্র। তবে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে সে বাড়ির একটি মোটরসাইকেল।

default-image

যে মোটরসাইকেলটি বাড়িতে ফেলে যান বাসিন্দারা, রাজাকার বাহিনী সেই বাহনটি তাদের কাজে ব্যবহার করতে থাকে। মনিরামপুর ও এর আশপাশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে তুলে নিতে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করা হতো। দুর্গম এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে যাওয়া কিংবা হত্যাকাণ্ডেও এটি ব্যবহৃত হতো।

গিরীন্দ্রনাথ ঘোষের নাতি বিপ্লব কুমার ঘোষ বলেন, ‘এই মোটরসাইকেল দিয়ে এমন জঘন্যতম কাজ করা হয়েছে জানতে পেরে আমরা কেউ আর এটি ব্যবহার করিনি। একাত্তরের গণহত্যা-নির্যাতনের স্মারক হিসেবে এটি আমার রেখে দিই। খুলনায় গণহত্যা জাদুঘরের কথা জনতে পেরে সেখানে হস্তান্তর করি।’

বিজ্ঞাপন

ঘুঙুরে পরিচয়

আপাতদৃষ্টে একাত্তরের বর্বরতার প্রতীক হিসেবে ঘুঙুরকে বেশ বেমানান মনে হয়। ঘুঙুর হলো মোটা সুতায় গাঁথা পিতলের ছোট ছোট একগুচ্ছ বল বা ঘণ্টা। প্রধানত নাচের তালবাদ্য হিসেবে ঘুঙুরের ব্যবহার আছে। তবে দর্শক বা ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সার্কাসের জোকার, বহুরূপী, ফেরিওয়ালারাও ঘুঙুর ব্যবহার করেন। একাত্তরে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার টাঙ্গন নদের দৌমোহনী ঘাটসংলগ্ন শ্রীমন্তপুরের একটি রাজাকার দল নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার্থে ঘুঙুর ব্যবহার করত। কোমরে ঘুঙুর থাকলে দলের অন্য সদস্যরা ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বুঝতে পারত এরা রাজাকার।

default-image

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রাম জালিয়াপাড়া। ১৯৭১ সালে এই গ্রামের মানুষের ওপর চালানো হয় বর্বরতম গণহত্যা। গণহত্যার সময় স্থানীয় রাজাকারদের কাছে বন্দুক ছিল এবং সহযোগী বাহিনীর সদস্যের চিহ্নস্বরূপ তাদের সবার কোমরে ছিল ঘুঙুর। রাজাকারদের কারও একজনের একটি ঘুঙুর সেদিন খুলে পড়ে যায়। সেই ঘুঙুর জালিয়াপাড়া গ্রামের বিজয় চন্দ্র দাসের পরিবার স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়।

বয়লারে পোড়াল ১০০ জনকে

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস লিমিটেড পরিণত হয়েছিল নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমিতে। বিশেষ করে পাটকলের বয়লারটি মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই বয়লারে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো বাঙালিদের।

default-image

প্লাটিনাম জুট মিলসহ আশপাশের পাটকলের বাঙালি শ্রমিক, স্বাধীনতাকামী স্থানীয়দের ধরে আনত ঘাতকেরা। তাদের বেঁধে বয়লারে প্রথমে পা ঢোকানো হতো এবং পা পোড়ানো হলে শরীরের বাকি অংশও বয়লারে ঢোকানো হতো। আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হতো পুরো এলাকা, অবর্ণনীয় যন্ত্রণা দিয়ে পোড়ানো হতো পা থেকে মাথা। সবশেষে পুরো বস্তাবন্দী করে নিক্ষেপ করা হতো বয়লারে।

বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দেওয়া এবং প্রতিশোধ গ্রহণ ছিল এই নিদারুণ বর্বরতার মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন সময়ে প্লাটিনাম জুট মিলের বয়লারে কমপক্ষের ১০০ শ্রমিককে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এ ছাড়া প্লাটিনাম জুট মিলে প্রায় ৭০০ শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বর্বরতার বেয়নেট

একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা-নির্যাতনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা ও নির্যাতন। প্রায় সব গণহত্যা-নির্যাতনে দেখা যায় গুলি করার পর বেয়নেট চার্জ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শুধু বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার মতো বর্বরতার নজিরও পাওয়া যায়।

default-image

একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের বেয়নেট চার্জ করে নৃশংস বর্বরতার সাক্ষী ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঈশ্বরদী, কোদালিয়া ও ছোট পাইককান্দি গ্রামের মানুষ। ১৯৭১ সালের ১ জুন এই তিন গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা নরক নামিয়ে এনেছিল। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল ৩৭ জনের বেশি মানুষকে। নির্যাতিত হয়েছিল অনেকেই। পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা-নির্যাতনে ব্যবহৃত একটি বেয়নেট ফেলে যায় কোদালিয়া গ্রামে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হান্নান মুন্সী প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে বর্বরতার প্রতীক সেই স্মারক নিজের কাছে আগলে রেখেছিলেন। ২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল স্মারকটি তিনি তুলে দেন গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি মুনতাসীর মামুনের হাতে।

বেদনাদায়ক বেত

ফরিদপুর জেলার নগরকান্দার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকাররা পরাজিত হতে থাকলে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিবাহিনীকে দমন করার চেষ্টা করে। একদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে প্রতিরোধযুদ্ধ। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন, দুজন লেফটেন্যান্টসহ ২৯ জন সৈনিক এবং জাফর মিয়া নামের একজন রাজাকার নিহত হয়।

default-image

মুক্তিবাহিনীর এই শক্ত প্রতিরোধ এবং প্রায় ৩০ জন সেনাসদস্যের মৃত্যু পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। এরপর ফরিদপুর সদর, ভাঙ্গা, মুকসুদপুর হতে পাকিস্তানি সেনারা নগরকান্দায় প্রবেশ করে নগরকান্দা থানায় তাদের স্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে। ক্যাম্প স্থাপনের পর থেকে পাকিস্তানি সেনারা নগরকান্দার বিভিন্ন স্থানে থেকে সাধারণ জনগণকে নগরকান্দা থানায় ধরে এনে নির্যাতন শুরু করে। বেত দিয়ে পিটিয়ে কারা সেনাসদস্যদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত, সেটি বের করার চেষ্টা করা হতো।

ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে নগরকান্দা থানা দখল করেন। নগরকান্দা থানা দখলের পর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই নগরকান্দা থানা নির্যাতন ক্যাম্প থেকে বেতটি উদ্ধার করে তাঁর কাছে রেখে দেন। কয়েক শ নিরীহ মানুষের রক্ত লেগে থাকা বেতটি একাত্তরের নির্মমতার স্মারক হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে গণহত্যা জাদুঘরে।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন