বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

সামিউল তখন ক্লাস ক্যাপ্টেন

কুমিল্লা হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়েন সামিউল আলম। শিক্ষকদের স্নেহের ছাত্র। ক্লাস ক্যাপ্টেনও তিনি। ক্যাপ্টেন হিসেবে চক, ডাস্টারসহ বেত সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই একদিন আচমকাই চক হাতে বানিয়ে ফেললেন ‘কিছু একটা’। দিনে দিনে এই ‘কিছু একটা’ হয়ে উঠল খুদে ভাস্কর্য। হয়ে উঠল স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান। বন্ধুরা প্রশংসাবাক্যে অনুপ্রেরণার সলতে জ্বালিয়ে দিল। সামিউল আর থামেন কীভাবে!

default-image

খড়িমাটির চার্লি চ্যাপলিন

২০০১ সালে এসএসসি পাসের পর সামিউল আলম ভর্তি হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। ভাস্কর্য বানানোর চর্চা তখন চলমান। তবে ভাবনায় এসেছে পরিবর্তন। চিন্তা করলেন, কল্পনার সুপারহিরোদের রেখে বাস্তবজীবনের নায়কদের ভাস্কর্য বানাবেন। খড়িমাটিতে মূর্ত হয়ে উঠল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাদার তেরেসা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হুমায়ূন আহমেদসহ খ্যাতিমান অনেক মানুষ।

সামিউল আলমকে জিজ্ঞেস করি, বাস্তবের নায়কদের মধ্যে প্রথম কার ভাস্কর্য বানালেন? ত্বরিত উত্তর, ‘চার্লি চ্যাপলিনের।’ দম নিয়ে আবার বলেন, ‘চার্লি চ্যাপলিন মানুষকে হাসান, নির্মল আনন্দ দেন। তাঁর মতো কজন পারে মানুষকে আনন্দ দিতে। অনেকের মতো তিনিও আমার কাছে বাস্তবের নায়ক।’

উভয়সংকট

এইচএসসি পাসের পর চারুকলায় পড়ার স্বপ্ন ছিল। প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলে পড়লেন বিপাকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষা একই দিনে পড়ল। পরিবার চাইল সামিউল এলাকায় থাকুক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিক। পরিবারের ইচ্ছের কাছে নতিস্বীকার করলেন সামিউল। অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হলেন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে।

default-image

ও আবার কিসের শিল্পী

ইচ্ছের কাছে হারলেও স্বপ্নের কাছে হারেননি সামিউল। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় চিত্রাঙ্কনে যে হাতেখড়ি, নিজে নিজেই তার চর্চা করে আসছিলেন তিনি। ভাস্কর্য তৈরিও চলতে থাকল। কলেজে বানানো বেশ কিছু ভাস্কর্য ভেঙে যাচ্ছিল, অনেক সময় উইপোকার মতো এক প্রজাতির পোকা খেয়ে ফেলছিল, নিজেই সংরক্ষণের উপায় বাতলে দিলেন। কম্পাসের কাঁটা ফেলে তখন ভাস্কর্য তৈরিতে সেলাইয়ের সুচ ব্যবহার শুরু করেছেন।

নিজের চিত্রকর্ম যখন মানুষকে দেখাতে চাইলেন। হাজির হলেন কোনো প্রদর্শনীতে। দর্শনার্থীদের বাহবা পেলেও চারুকলায় শিক্ষা নেই বলে অনেকের মুখে শুনলেন, ‘ও আবার কিসের শিল্পী!’

সামিউল বলেন, ‘আমি ভীষণ কষ্ট পেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, চারুকলায় পড়াশোনা করব।’

চারুকলার পাঠ

সেশনজটের চক্করে সামিউলের স্নাতক শেষ হলো ২০১১ সালে। বন্ধুরা চাকরির জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। কারও কারও ব্যাংকে চাকরিও হয়ে গেল। ওদিকে সামিউল বসলেন পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে।

মাস্টার্সের পাশাপাশি তিনি কুমিল্লা আর্ট স্কুলে এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। এবার ঢাকায় যেতে হবে। ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হবেন। কিন্তু বাড়ি থেকে সেই অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল না। বলা হচ্ছিল, চাকরির খোঁজ না করে কেন এসব পাগলামো!

তবে সামিউলের একাগ্রতার কাছে একসময় হার মানল পরিবার। ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন সামিউল। পড়াশোনার পাশাপাশি চারুকলার শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিলেন কুমিল্লা হাইস্কুলে। চলতে থাকল ভাস্কর্যচর্চাও।

সামিউল আলম বলেন, ‘এরই মধ্যে পাঁচ বছরের কোর্স শেষ করেছি। এখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করব। অবশ্যই ভাস্কর্য নিয়ে!’

default-image

চর্চা চলছে

সামিউল আলম এখন কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজের চারুকলার শিক্ষক। পেশাগত কাজ শেষে মনোযোগী হন শখের কাজে। স্রেফ খেয়ালের বশে যে খড়িমাটির ভাস্কর্য বানানো শুরু করেছিলেন, দিনে দিনে তা-ই হয়ে উঠেছে তাঁর শখের বিষয়। বানিয়েছেন দুই শতাধিক ভাস্কর্য।

সামিউল বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননা আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে। আমি এখন ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের মুহূর্ত খড়িমাটিতে ফুটিয়ে তোলার কাজ করছি।’

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন