বিজ্ঞাপন
default-image

সপ্তদশ শতকের লোককবি এই চন্দ্রাবতী জন্মেছিলেন মনসা মঙ্গল রচয়িতা কবি দ্বিজ বংশীদাস আর সুলোচনা দেবীর ঘরে, কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়ারি নামের এই ছোট্ট সবুজ গ্রামটাতে। মৈমনসিংহ গীতিকার এক সফল পালাকারই শুধু নন, তিনি এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী রামায়ণেরও রচয়িতা।

পুরুষ লেখক ও পালাকারদের রচনায় রামায়ণ যুদ্ধ, বীরত্ব আর ভক্তিরসের কাহিনি। ছিনিয়ে নেওয়া আর পুনরুদ্ধার করা, জয় আর পরাজয়ের সেই চিরপুরোনো গল্প। মূল কাহিনিকার থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য—রামায়ণের গল্পে কোথাও রাম হলেন বীর, কোথাও রাবণ। কিন্তু সীতা কে? সীতা অপহৃত, সীতা অপবাদের শিকার, অপমানিত ও তিরস্কৃত এক নারী, দুঃখ ও বেদনায় একাকী এক সত্তা, আর সবশেষে নিজের সতীত্ব প্রমাণ করার দায়ও তার একারই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সীতা কেবল এক অমূল্য হৃত সম্পদ, আভিজাত্য আর মান–সম্মানের প্রতীক, আর সব যুদ্ধের মতো সীতাও এখানে পুরুষের বিজিত সম্পত্তির বাইরে কিছু নন। এখানে ‘মানুষ’ সীতা কই? কাকে ভালোবেসেছেন তিনি? কাকে দিয়েছেন মনপ্রাণ? কে তার মনের খবর রাখে? আর দশজন নারীর মতো নির্ভেজাল প্রেম, দাম্পত্য, সংসার ও সুখের জীবন যে মেয়েটি পায়নি, যুদ্ধের আর আভিজাত্যে লড়াইয়ের দামামার মধ্যে যার সুখস্বপ্ন আর সহজ জীবনটা হারিয়ে গেছে, কে তার সেই বেদনা ছুঁয়েছে? বীর ও দেবতুল্য স্বামী হোক, কি বিত্তবৈভবে পূর্ণ অহংকারী রাবণ—কেউ কি তাকে সত্যিকারের প্রেয়সীর মর্যাদা আর সম্মান দিয়েছেন? ভালোবেসেছেন স্বার্থহীনভাবে?

default-image

পুরুষ পালাকারেরা এসব নিয়ে কখনো ভাবেননি। এ প্রশ্ন কখনো করেননি। করেছেন গ্রামের এই সাধারণ পালাকার নারী। তিনি চন্দ্রাবতী।

খুবই আশ্চর্য যে পুরুষতান্ত্রিক এই কাহিনিতে চন্দ্রাবতীর রামায়ণ পালায় সীতাই মুখ্য চরিত্র। রামের একনায়কত্বকে নস্যাৎ করে দেন তিনি। রাম বা রাবণ কারও প্রতিই ভক্তিরসে বা শ্রদ্ধায় আপ্লুত নন। চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিযুক্ত করেছেন রামায়ণকে। বরং সীতার জন্ম ও বেড়ে ওঠাকে বর্ণনা করেছেন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে।

শুভদিন শুভক্ষণ গো, পূর্ণিত হইল।

ডিম্ব ফুটিয়া এক কন্যা ভূমিষ্ঠ হইল॥

সর্ব সুলক্ষণা কন্যা গো, লক্ষ্মী স্বরূপিনী।

মিথিলা নগর জুইড়্যা গো, উইঠল জয়ধ্বনি॥

জয়াদি জোকার দেয় গো, কুলবালাগণ।

দেবের মন্দিরে বাদ্য গো, বাজে ঘনে ঘন॥

স্বর্গে মর্ত্যে জয় জয় গো, সুর-নরগণে।

হইল লক্ষ্মীর জন্ম গো মিথিলা ভবনে॥

সতার নামেতে কন্যার নাম রাখে গো, সীতা।

চন্দ্রাবতী কহে গো, কন্যা ভুবন বন্দিতা॥

চন্দ্রাবতীর রামায়ণের গোটা কাহিনিই আবর্তিত হয়েছে সীতাকে ঘিরে, সীতার সীমাহীন বেদনা, কষ্ট, অপমানকে চিত্রিত করে, রামায়ণের বীররস ও শৃঙ্গাররস এখানে অনুপস্থিত। বরং এ এক দুঃখী অপমানিতা–বঞ্চিতা নারীর গল্প, যে গল্প বাংলার ঘরে ঘরে, শহরে–গ্রামে পুনঃপুন অভিনীত হয় যুগ যুগ ধরে।

কিন্তু কে এই চন্দ্রাবতী? কীভাবে মধ্যযুগের গ্রামীণ এই ব্রাহ্মণ কন্যা হাতে তুলে নিয়েছিলেন লেখনী, আর সেই লেখনীতে পুরাণের নায়িকাকে এঁকেছেন একেবারেই নিজের মতো করে, অন্যদের চেয়ে আলাদা? চন্দ্রাবতীর আবিষ্কর্তা দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে, চন্দ্রাবতীর রামায়ণ একেবারেই মৌলিক রচনা, মিল নেই অন্য কোনোটার সঙ্গেই। যেমন এখানে তিনি এনেছেন কৈকেয়ীর কন্যা কুকুয়াকে, যে রামচন্দ্রের কাছে সীতা সম্পর্কে অপবাদ দিচ্ছে। এই চরিত্রটির উপস্থিতি অন্য কোনো রামায়ণে নেই। এই কুকুয়ার কথায় রাম যখন সীতার চরিত্র সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন, তখন পালাকার চন্দ্রাবতী রামকে তিরস্কার ভর্ৎসনা করতে ছাড়েননি। এমন পরিশীলিত রামায়ণ আর কেউ লেখেননি। কিন্তু মধ্যযুগীয় এই নারী কী করে পারলেন?

কারণ চন্দ্রাবতী নিজেও যে পুরাণ কাহিনির সীতার মতোই ট্র্যাজিক এক নায়িকা। নিজেও তিনি প্রেমবঞ্চিত, সমাজের কাছে অপমানিত, ধৈর্যে অটল কিন্তু হৃদয়ে ব্যাকুল, আর তারও যে বুকজুড়ে খালি অভিমান, তিনিও যে শেষমেশ পাতালে নয়, নির্জন কাব্যমন্দিরে প্রবেশ করেই নিজের জ্বালা জুড়িয়েছিলেন। লিখেছেন তিনি নিজের রচিত পালাগানে—

দুই হস্ত জুড়ি সীতা গো, অগ্নি প্রণাম করিল।

ধীরে ধীরে অগ্নিকুণ্ডে গো, সীতা প্রবেশিল॥

সেই ক্ষণে হইল কিবা গো, দৈবে অঘটন।

বসুমতী উঠিল কাঁইপ্যা গো, কাঁপিল অযোধ্যা ভুবন॥

চিতা ফাইট্যা উঠিল গো, পাতাল গঙ্গা ভোগবতী।

তার সঙ্গে উইঠ্যা আইল গো মাতা বসুমতী॥

বসুমতী কয়, ‘মাগো আইস আমার কোলে।

দুঃখিনী কন্যারে লয়্যা গো আমি যাইব পাতালে॥

সুখে থাউক রাজা রাম গো রাইজ্য প্রজা লয়্যা।

আমার কন্যা সীতারে আমি গো লয়্যা যাই চলিয়া॥

এই না কথা বইলা দেবী গো সীতারে লইল কোলে।

পাতালে প্রবেশিল সীতা গো দেখিল সগলে॥

ওই যে ঘৃণাভরে তাঁর প্রত্যাখ্যান আর অভিশাপ, ‘সুখে থাউক রাজা রাম গো রাইজ্য প্রজা লয়্যা’ কজন এমন ধৃষ্টতা দেখাতে পারে? তিনি নিজেও কি এভাবেই নিজেকে শেষ করে দেননি; সমস্ত সুখ, সম্পদ ও সামাজিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে কেবল কাব্যকে ভালোবেসে?

মৈমনসিংহ গীতিকার নয়নচাঁদ ঘোষের চন্দ্রাবতী পালা থেকে জানবেন—সেই শৈশব থেকে জয়ানন্দর সঙ্গে সখ্য চন্দ্রাবতীর। মুখে মুখে শ্লোক রচনা, পূজার জন্য একত্রে ফুল তুলতে গিয়ে খেলা করা, এরপর প্রণয়—জয়ানন্দ তাঁর চিরকালের প্রণয়সখা। কবি নয়নচাঁদ ঘোষ বর্ণনা করেন, ‘ডাল যে নোয়াইয়া ধরে জয়ানন্দ সাথি।/ তুলিল মালতী ফুল কন্যা চন্দ্রাবতী॥/ একদিন তুলি ফুল মালা গাঁথি তায়।/ সেইত না মালা দিয়া নাগরে সাজায়॥’

এই প্রণয় ও বিবাহে সম্মতি ছিল পিতার। তাই বিবাহের আয়োজন শুরু, চন্দ্রাবতী সাজলেন বধূর বেশে। কিন্তু তখনই সেই মর্মন্তুদ সংবাদ। জয়ানন্দ পাশের গাঁয়ের এক মুসলিম কিশোরীর প্রেমে পড়ে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, জয়নাল নাম নিয়ে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। চন্দ্রাবতী অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত, শোকে পাথরহৃদয়ে শুদ্ধচারিণী হলেন। পিতার কাছে আরজি জানালেন দুটি—ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা, আর আজীবন চিরকুমারী থাকার ইচ্ছা।

কন্যার শোক লাঘবে তাঁর কবি পিতাই তাঁকে রামায়ণ রচনায় উৎসাহিত করেন, চন্দ্রাবতী হয়ে ওঠেন কবি, যেন কষ্টের কষ্টিপাথরে খোদাই করা এক দেবী। নিজের সব শোক, কষ্ট ও বেদনা ঢেলে দিয়েছেন তিনি রামায়ণের সীতা চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে, দেখিয়েছেন সীতারও আছে এক সাধারণ নারীর হৃদয়। যে হৃদয়কে কোনো বীরপুরুষই ধারণ করতে পারেনি। মধ্যযুগে আর কেউ এভাবে পুরাণের সীতাকে দেখেনি। দেখতে পায়নি।

জয়ানন্দ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। অনেক দিন পরে ছুটে এসেছিলেন প্রণয়ীর কাছে। কিন্তু চন্দ্রাবতী যে তখন বদলে গেছেন। শোক ও বেদনা তাঁকে তত দিনে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জয়ানন্দ আর তাঁর নাগাল কী করে পাবে? শিবমন্দিরে গভীর ধ্যানে মগ্ন চন্দ্রাবতী জয়ানন্দের ডাকে সাড়া দেননি আর। সন্ধ্যামালতীর ফুল নিংড়ে কয়েক ছত্র প্রেয়সীর উদ্দেশে মন্দিরের কপাটের কাছে লিখে রেখে গিয়েছিলেন জয়ানন্দ, ‘শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৈবনকালের সাথি।/ অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী।/ পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হইলা সম্মত।/ বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো॥’

অনেক পরে ধ্যান ভাঙলে চন্দ্রাবতী দেখতে পান এই কবিতা। মন্দির ধুয়ে ফেলার জন্য জল আনতে গিয়ে দেখেন অনুশোচনায় দগ্ধ হতভাগ্য প্রেমিক ভাসছে সেই ফুলেশ্বরীর জলে। ‘জলে গেল চন্দ্রাবতী চক্ষে বহে পানি।/ হেনকালে দেখে নদী ধরিছে উজনী।/ একেলা জলের ঘাটে সঙ্গে নাহি কেহ।/ জলের উপরে ভাসে জয়ানন্দের দেহ।’

শোকে মুহ্যমান চন্দ্রাবতী বাকি জীবন পিতার তৈরি এই শিবমন্দিরে শিবের আরাধনায় কাটিয়ে দিয়েছিলেন। রামায়ণ ছাড়াও লিখেছেন আরও দুটি কাব্য—মলুয়া ও দস্যু কেনারামের পালা। তাঁর মলুয়াও ক্ষমতার কাছে মাথা না নোয়ানো এক সাহসী নারীর মর্যাদার লড়াই। বাংলা সাহিত্যের তিনিই প্রথম নারী কবি। শত বছর ধরে কিশোরগঞ্জ–ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফেরে তাঁর পালাগান। চাঁদবিনোদ আর মলুয়ার স্মৃতিবিজড়িত আরালিয়া গ্রাম, ধনু নদী, পদ্মফুলে ভরা ধলাই বিলে আষাঢ় মাসের ঘন কালো আকাশের নিচে এখনো মাঝিরা, জেলেরা গায় তাঁর গান, বিয়ের গীতে তাঁর গান গেয়ে নেচে ওঠে এখনো মেয়েরা, পাশাখেলা কি ব্রতের সময় শোনা যায় তাঁর গান। আমাদের আদি নারী কবি খনা, মাধবী দাসী কি আনন্দময়ীর মতো চন্দ্রাবতীও এক আশ্চর্য সুন্দর পদ্মফুল, এক কাজলকালো পুকুরের মধ্যে একা মাথা উঁচু করে থাকা মাছরাঙা পাখি।

কবি চন্দ্রাবতীর প্রাচীন শিবমন্দিরকে পেছনে ফেলে আরেকটু এগোলেই এবার চোখে পড়বে একটা ভগ্ন গৃহ—এখানে–ওখানে ইট বের হওয়া, শেওলা ধরা দ্বিতল ভবন। বাড়িটি চন্দ্রাবতীর পূর্বপুরুষ নীলকণ্ঠ রায়ের বলে ধারণা সবার। কপালে সিঁদুর দেওয়া এক নারী বাটনা বাটছেন ওপাশের উঠানে, খালি গায়ে রোদ পোহাচ্ছেন পৈতা পরা ব্রাহ্মণ পুরুষ। পেছন দিকে একটা পানা পুকুর; যার ঘাটটি ভাঙা, দুই ধারে ভগ্ন দেয়াল, বড় একটা গাছের গুঁড়ি শুয়ে আছে ঘাটের পথজুড়ে এমাথা–ওমাথা। পুকুরের ওপর একটা খুঁটিতে তখনো চুপচাপ বসে আছে সেই মাছরাঙা পাখিটা। এই ঘাট, এই মন্দির, এই ভাঙা দেয়ালের গায়ে এক দুখিনী নারীর দীর্ঘশ্বাস এই ভরদুপুরবেলাও একঝাপটা বাতাসের মতো ভেসে যায় হঠাৎ। কবিতা আর শ্লোকে জীবনের না পাওয়ার বেদনা ভুলেছিলেন যে নারী, কাব্যকেই করেছিলেন জীবনযাপনের ধ্যান, তিনি যেন এই মাত্র ধ্যান ভেঙে চেয়ে দেখবেন মন্দিরের চাতালে পড়ে আছে এক গুচ্ছ সন্ধ্যামালতী ফুল। বেদনার্ত হৃদয়ে গেয়ে উঠবেন, ‘নিজের অন্তরের দুষ্কু পরকে বুঝান দায়!’ আসলেই এই পৃথিবীতে কে কার অন্তরের দুঃখ কতটা বুঝতে পারে?

মাছরাঙাটা উড়ে গেলে এরপর আমরাও সেই রহস্যময়ী নারীকে ছেড়ে কোলাহলের শহরে ফিরে এলাম।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন