এমন অনেক সদস্যের হাত ধরে এগিয়ে চলছে প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম
এমন অনেক সদস্যের হাত ধরে এগিয়ে চলছে প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমসংগৃহীত

প্ল্যাটফর্ম?

‘হ্যাঁ, আমাদের সংগঠনটি প্ল্যাটফর্ম নামেই পরিচিত। মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসকদের মঞ্চ।’ সংগঠনটি সম্পর্কে চট করে তথ্য দিলেন তরুণ চিকিৎসক ফয়সাল বিন সালেহ। তিনি প্ল্যাটফর্মের জাতীয় পর্ষদের সভাপতি। আরও জানালেন, ‘প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটি’ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির পোশাকি নাম। দেশের চিকিৎসকদের অধিকার আদায়, নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি, নিজেদের দক্ষতা অর্জনসহ সেবামূলক বিভিন্ন কাজ করে সংগঠনটি। করোনাকালেও মানুষের সেবায় ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় কাজ করে চলেছে প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনের ফেসবুক গ্রুপে বর্তমানে যুক্ত আছেন প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার মানুষ, যাঁদের মধ্যে যেমন আছেন দেশবরেণ্য চিকিৎসক, তেমনি আছেন মেডিকেল শিক্ষার্থীও।

করোনাকালেই জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সংগঠনটি সম্পর্কে জেনেছিলাম। বিশেষ এই নম্বরে ফোনকল করে পাওয়া যায় করোনাভাইরাসের তথ্যসেবাসহ চিকিৎসা পরামর্শ। যাঁরা সেবা দিচ্ছেন, তাঁরা সবাই চিকিৎসক। প্রত্যেকেই স্বেচ্ছাসেবী। এই স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকেরা যুক্ত হয়েছেন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। সেই সূত্র ধরেই ফয়সাল বিন সালেহর সঙ্গে আলাপ। কর্মজীবনে ডিজিটাল হেলথকেয়ার সলিউশনস নামের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি সমন্বয়ক ফয়সাল বললেন, ‘করোনার সময়টায় আমরা নানা ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।’

আলাপের শেষে করোনাকালসহ প্ল্যাটফর্মের নানা কার্যক্রমের বিস্তারিত পাঠালেন ফয়সাল। কাজের খতিয়ান পড়তে পড়তে মুগ্ধ হতে হলো, একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কত কাজের সঙ্গে যুক্ত, স্বেচ্ছাসেবকেরা কী দারুণভাবে কাজ করে চলেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনাকালের প্ল্যাটফর্ম

চীনের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাস এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, আর কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীর প্রথম মৃত্যুও হলো চীনেই। ২০২০ সালের জানুয়ারির সেই সময়ে তৎপর হলো ‘প্ল্যাটফর্ম’। সংগঠনটি নিজেদের চিকিৎসাবিষয়ক নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে করোনাভাইরাস বিষয়ে আলোচনা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করল। প্রকোপ যখন ছড়াতে থাকল, দিনে দিনে বাড়ল প্ল্যাটফর্মের যুক্ততা।

সারা দেশে চিকিৎসকদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করতে গড়ে তুলল ‘পিপিই ব্যাংক’। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এই ব্যাংকের মাধ্যমে ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ৩৩২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ১০ হাজার ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) দিয়েছে তারা।

গত বছরের মার্চে ছুটি ঘোষণা করল সরকার। তার কিছুদিন পর অনেক পেশাজীবীর মতো করোনার ঢেউয়ে চিকিৎসকেরাও কেউ কেউ চাকরি হারালেন। অভাবের দিনগুলোতে এমন চিকিৎসকের পাশে দাঁড়াল প্ল্যাটফর্ম। ফান্ডামেন্টাল রাইটস ফর বেটার হেলথের সহযোগিতায় ২৬ জন চিকিৎসককে খুঁজে বের করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলো। মানুষকে সহায়তার সেই ব্রত পালনের সময়ই সংগঠনটির সদস্যরা খেয়াল করলেন, প্লাজমার প্রয়োজন। উদ্যোগ নেওয়া হলো ‘প্ল্যাটফর্ম প্লাজমা ডোনার পুল’ গঠনের। এ পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি কোভিড-১৯ রোগীকে প্লাজমা সংগ্রহ করে দিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া করোনাকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেশ কিছু কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত আছে প্ল্যাটফর্ম। আগেই যেমনটি বলেছি, প্ল্যাটফর্মের প্রায় তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-এর মাধ্যমে টেলিফোনে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত করোনা কন্ট্রোল রুমে কাজ করছে প্ল্যাটফর্মের ২০ সদস্যের একটি দল, আছে নানা উদ্যোগের সঙ্গে।

প্ল্যাটফর্মের পরিধি

প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। দিনে দিনে সংগঠনটির পরিধি বেড়েছে। ফয়সাল বিন সালেহ জানালেন, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কেন্দ্রীয় পর্ষদ এবং ১২টি আঞ্চলিক পর্ষদের মাধ্যমে সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালনা করে। দেশের ১১৭টি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম রয়েছে। কার্যকরী সদস্য ১ হাজার ৪৮১ জন। নিয়মিত চাঁদা (চিকিৎসকেরা ১০০ ও শিক্ষার্থীরা ৫০ টাকা) দেন তাঁরা। চাঁদা হিসেবে পাওয়া অর্থেই পরিচালিত হয় প্রাথমিক সংগঠনের কার্যক্রম। বৃহৎ পরিসরে কোনো আয়োজন থাকলে সংগ্রহ করা হয় অনুদান, নেওয়া হয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা।

সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন ও প্রসারেও। তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে জড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সঙ্গে। মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজপড়ুয়াদের জন্য আয়োজন করে চলছে পেশাবিষয়ক অনুষ্ঠান। রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ, বন্যাদুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করাসহ সংগঠনটি বিভিন্ন জনসচেতনতা ও জনসেবামূলক কাজ করেছে।

এসব কার্যক্রমই অনুপ্রাণিত করছে সদস্যদের, সদস্য হতে উৎসাহ জোগাচ্ছে মেডিকেলপড়ুয়াদের। গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী ও প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পর্ষদের দপ্তর সম্পাদক ফাহমিদা হক বলছিলেন, ‘প্ল্যাটফর্মে আমি যুক্ত হয়েছি ২০১৮ সালে। সংগঠনের মূলনীতি, উদ্দেশ্য আমাকে কার্যক্রমে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। দিনে দিনে আমি নিজেও সংগঠনের কাজ করে সমৃদ্ধ হয়েছি।’

বিজ্ঞাপন

গোড়ার কথা

প্ল্যাটফর্মের গোড়াপত্তনের সঙ্গে ডা. মহিবুর হোসেনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যোগসূত্র বের হলো আলাপের সময়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের এই রেসিডেন্ট চিকিৎসক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইন্টার্নশিপ শেষে পেশাজীবনে প্রবেশ করেই দোটানায় পড়েছিলেন। অনুভব করেছিলেন সঠিক পরামর্শ আর দিকনির্দেশনার। শিক্ষা ও কর্মজীবনে কখন কোন সিদ্ধান্ত নিলে উপকার পাওয়া যায়, সে বিষয়টি জানার সুযোগ কম। সেই চিন্তা থেকে এমন মঞ্চ তৈরি করতে চাইলেন, যেখানে সমস্যার কথা বলা যাবে, পরামর্শ পাওয়া যাবে অভিজ্ঞদের কাছে। মহিবুর হোসেন বলেন, ‘মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ চিকিৎসকদের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আসে। অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়তে হয়। এ চিন্তা থেকেই সামাজিক মাধ্যমে তখন গ্রুপটা শুরু করা।’

এ ছাড়া ২০১১-১২ সালে চিকিৎসকদের সঙ্গে বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। কয়েকজন চিকিৎসককে প্রাণ হারাতে হয়। চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো সেভাবে প্রতিবাদ করেনি। তাই চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও তাঁরা এককাট্টা হন। এই ‘তাঁরা’ হলেন ডা. মারুফুর রহমান, ডা. আসিফ উদ্দিন খান, ডা. আহমেদুল হক ও ডা. সিফাত খন্দকার। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের সমমনা এই তরুণ চিকিৎসকেরা শুরু করলেন ‘প্ল্যাটফর্ম’। মেডিকেলপড়ুয়া ও নবীন চিকিৎসকদের পেশাগত দিকনির্দেশনা ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁদের ব্রত।

ডা. মহিবুর হোসেন বলেন, ‘একসময় আমরা পেশাগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের জুনিয়র যারা, তারা নেতৃত্বে আসতে থাকল। দিনে দিনে উজ্জ্বলতা ছড়াল। প্ল্যাটফর্ম এখন তো বড় এক পরিবার।’ সেই প্ল্যাটফর্ম পরিবার সদস্যদের সুন্দর আগামীর জন্য পথ তৈরি করে দিচ্ছে, সোচ্চার থাকছে অধিকার আদায়ে—সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায়।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন