বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চলতি পথে তোলা ছবিটি একসময় তিনি পাঠান প্রতিযোগিতায়। নানা ধাপ পেরিয়ে প্রতিযোগিতায় স্বীকৃতি পায়। দেশের গণমাধ্যমে খবর হয় তাঁর অর্জনের। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী ছবিটি এখন প্রদর্শিত হবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানের গ্যালারিতে। দর্শনার্থীরা দেখবেন বাংলাদেশের নগরজীবনের দুর্ভোগের এক করুণ সত্য দৃশ্য। দেখা যাবে একজন দরজির জীবনগল্প। কিন্তু ছবির সেই মানুষ কি জানেন, ঢাকার নিদারুণ এক দৃশ্যপটে তাঁকে দেখেছে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ?

পেশাগত কারণে কারওয়ান বাজারে দিনভর থাকি। ছবির এই মানুষের সঙ্গে একবার দেখা করলে কেমন হয়! বেরিয়ে পড়ি ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। ছবির মানুষকে পেতে পানির মধ্যে চৌকি পাতা জায়গাটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির এক অংশে লেখা ‘কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট’। কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট নামে দুটি বিপণিবিতান আছে। প্রাত্যহিক যাতায়াত বলেই জানি, দ্বিতীয় বিপণিবিতানের সামনেই দরজি আর অস্থায়ী কাপড়ের দোকান বসে। সেই বিপণিবিতানের সামনে যাই। নিজেকে যখন ‘পাতি গোয়েন্দা’ ভাবা শুরু করেছি, তখনই পেয়ে যাই ছবিতে দেখতে পাওয়া সাইনবোর্ড।

মঙ্গলবার কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট বন্ধ থাকে। তাই মানুষের আনাগোনাও কিছুটা কম। বিপণিবিতানের সামনের সড়কে কয়েকটি অস্থায়ী পোশাকের দোকান পাতা। এক জায়গায় একটা চৌকি উপুড় করে তুলে রাখা। এটাই কি ছবির সেই চৌকি? প্রশ্নটা মনে চেপে রেখে এক দোকানিকে মুঠোফোনে ছবিটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘চেনেন, ছবির এই মানুষকে?’

দোকান গুটিয়ে আনছিলেন লোকটি, ছবি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলেন, ‘মোশারফ চাচার মতো মনে হয়...’

নিশ্চিত হতে তিনি আরেকজনকে ছবিটি দেখান। দ্বিতীয়জন নিশ্চিত করেন, ‘মোশারফ চাচাই তো’।

দুজনে তখন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আমার দিকে দৃষ্টি রাখেন। ছবির গল্প আর আমার উদ্দেশ্য তাদের খোলাসা করে বলি। তখন পাশে বসা একজনকে দেখিয়ে বলেন, ‘তিনি মোশারফ চাচার ভাই। আমি তাঁর ভাতিজা হই। কিন্তু চাচা তো নাই!’

‘আজ তিনি আসেননি? এখন এখানে আর বসেন না?’

‘গত বছরের ২৫ আগস্ট তিনি মারা গেছেন’, পাশ থেকে উত্তর দেন শাহ আলম খান। প্রয়াত মোশারফ খান দরজির ছোট ভাই তিনি। শাহ আলম খানও একসময় দরজির কাজ করতেন। এখন কাপড়ের ব্যবসা করেন। তাঁদের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলায়। কারওয়ান বাজারে আছেন প্রায় ৪০ বছর ধরে।

‘বড় ভাই তখন রাজাবাজারে কাজ করেন। পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য জার্সি আর মশারি সেলাই করে দিতেন চুক্তিতে। ভালো অবস্থা ছিল। তারপর অসুস্থ হয়ে গেলেন।’ বড় ভাই মোশারফের গল্প বলেন শাহ আলম।

মোশারফ খান প্রায় ১৫ বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। মাসে প্রায় ২০ দিনই মানসিক সমস্যায় ভুগতেন। অসংলগ্ন আচরণ করতেন। তখন নিজেই চলে যেতেন গ্রামের বাড়ি, স্ত্রী-সন্তানদের কাছে। দিন কয়েক পর সুস্থ বোধ করলে ফিরে আসতেন কারওয়ান বাজারে। বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। মানসিক সমস্যার সঙ্গে ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতাও বাসা বেঁধেছিল। গত বছরের আগস্টে অনেকটা আকস্মিকভাবেই তিনি মারা যান।

ভাই আর নিজের গল্প বলতে বলতেই শাহ আলম খান স্মৃতিকাতর হয়ে গিয়েছিলেন। পেশাগত ফোনকলে বাস্তবে ফিরলেন। আমাকে চা পানের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। আমি তখন ভাবছিলাম আলোকচিত্রী ফাহিম শাহরিয়ারের ছবিটির কথা। তিনি ছবিটি তুলেছিলেন জুলাই মাসে। তার মাস খানেক পর ছবির মানুষ মারা যান। আলোকচিত্রী ছবির নাম দিয়েছেন ‘কারওয়ান বাজার’। কারওয়ান বাজারে এমন অসংখ্য মোশারফ খান আছেন, তাঁদের কেউ দরজি, কেউ মিনতি, কেউবা তালাচাবি সারাইয়ের কারিগর। পুরস্কার পাওয়া ছবিতে জলাবদ্ধতা আর জীবিকার সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। কিন্তু আমার কাছে ছবিটি হাজির হয় কারওয়ান বাজারের শ্রমজীবী মানুষদের গল্প হয়ে।

একনজরে নিকন আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা

১৯৬৯ সাল থেকে জাপানের ক্যামেরা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিকন করপোরেশন পেশাদার ও নবীন আলোকচিত্রীদের জন্য আয়োজন করে আসছে ‘নিকন ফটো কনটেস্ট’। আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় এক দশক আগে যুক্ত হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এ বছর বিশ্বের ১৫০ দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর ৬৫ হাজারের বেশি ছবি ও ভিডিও জমা পড়েছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্র্যান্ড প্রাইজ, এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ও স্পেশাল এনকারেজমেন্ট অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। দ্বিবার্ষিক এই আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার এবারের আয়োজনে উন্মুক্ত শ্রেণির বিষয় ছিল ‘কানেক্ট’ বা সংযোগ আর নেক্সট জেনারেশন শ্রেণির (অনূর্ধ্ব–২৫) বিষয় ছিল ‘প্যাশন’। এবার সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছেন ইরানের আলোকচিত্রী আমিন নাজারি। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সেরা হয়েছে জাপানের রেই কুরোদার ৫ মিনিটের এক চলচ্চিত্র। প্রতিযোগিতার নেক্সট জেনারেশন বা পরবর্তী প্রজন্ম বিভাগে সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছে শাহরিয়ার ফাহিমের ‘কারওয়ান বাজার’। একই শ্রেণিতে বাংলাদেশের আরেক নবীন আলোকচিত্রী শাহেদুল ইসলাম পেয়েছেন বিশেষ উৎসাহ পুরস্কার।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন