default-image

১৯৮৭ সালের ১৪ জুলাই। ঝুমবৃষ্টির মধ্যে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) যোগ দিলাম আমরা। সেখানে প্রবেশের পর এক সপ্তাহ কেটেছে ঘোরের মধ্যে। সবার একরকম চুল ছেঁটে দেওয়া হয়েছে; একই পোশাক পরা সবাই। পূর্বপরিচিতকেও আলাদা করে চেনা মুশকিল। এরই মধ্যে একটা ছেলে যেন আলাদা। সুন্দর করে হাসে সে। আমরা কোনো সুযোগে ‘হা হা’ করে হাসলেও সে হাসে ‘হি হি’ করে। সেই হাসি কখনো সরব, কখনো নীরব। কিন্তু হাসির অপরূপ সৌন্দর্য ছিল। দ্রুতই ছেলেটার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় আমরা পেতে থাকলাম। আর একই সঙ্গে আবিষ্কার করলাম তার ভেতরের আভিজাত্য। জানলাম দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা মরমি গীতিকার ও সাধক দেওয়ান হাসন রাজার প্রপৌত্র। আমরা বুঝে গেলাম, কেন সবার মধ্যেও তাকে আলাদা করে চেনা যায়।

বিজ্ঞাপন

আমরা তত দিনে জানি, সেই ছোটখাটো ছেলেটা যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে এসেছে। বাড়িতে তার গাড়ি আছে, সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ায়; অথচ আচরণে কোনো বাহুল্য নেই। সুন্দর পোশাক পরে; ব্যবহার্য সবকিছুই সুন্দর আর রুচিসম্মত। প্রয়োজনে সাহায্যের হাত যেন বাড়িয়েই রাখে। পড়াশোনায় ভালো; ভালো বাস্কেটবল আর ভলিবল খেলায়ও। আবার যখন ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ আসত, তার মাথা থেকেই আসত সবচেয়ে সুন্দর বুদ্ধিটা। অল্পদিনেই আমরা সবাই সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করে আসা এই ছেলের কাছের বন্ধু হয়ে গেলাম।

বাড়ির মানুষেরা আদর করে ডাকে তাছরু। আমরাই–বা বাদ যাব কেন? আমরাও নাম সংক্ষিপ্ত করে নিলাম।

কমিশন পাওয়ার পর আমরা বিভিন্ন গ্যারিসনে ছড়িয়ে পড়লাম। তবে যুবা বয়সে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ আমরা একসঙ্গে করেছি। সেসব প্রশিক্ষণে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় আমাদের প্রশিক্ষকেরাও পেয়েছেন। কোনো সমস্যা সমাধানে সবাই মিলে যদি তিনটা সমাধান বের করতাম, চার নম্বরটা আসত তাছাওয়ারের মাথা থেকে। বিভিন্ন সময়ে, প্রশিক্ষণে এবং ব্যক্তিগত জীবনে, কত বুদ্ধি যে তার কাছ থেকে নিয়েছি, তা হিসাব করে বের করা মুশকিল।

default-image

তাছরুর ছিল ভ্রমণের শখ। পরিবারসহ কিংবা পরিবার ছাড়া—সুযোগ পেলেই সে বেরিয়ে পড়ত, দেশের ভেতরে কিংবা দেশের বাইরে। ৫০টির বেশি দেশ ভ্রমণ করেছে। সে পড়তে ও পড়াতে ভালোবাসত।

সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে ভালো অফিসাররাই প্রশিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাছরু ক্যাপ্টেন থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত অনেকটা সময় কাটিয়েছে প্রশিক্ষক হিসেবে। তার পড়াশোনা ছিল গবেষণাধর্মী। সেই গবেষণার ফসল জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে তার লেখা বই ও জেনারেল মাই জেনারেল; কিংবা তাঁর সম্পাদিত হাছন রাজা সমগ্র। এ রকম আরও কাজ তার আছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস লেখক দলের সদস্য ছিল সে।

default-image

প্রায়ই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) যাই। তাকে দেখি। তার সঙ্গে অনেক কথাও বলি। সে কি কিছু বোঝে, কিছু কি শোনে? চিকিৎসকেরা ভাবেন, শুনছে না। কিন্তু আমি যে প্রায়ই দেখি, কথা বলা শুরু করলেই, সে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে। তাকে দেখতে যেতে কয়েক দিন দেরি হলেই, দোস্ত যে অভিমান করে, তার চোখ বেয়ে পানি পড়ে।

কিছু না বুঝলে, এমন কেন হবে? তাছরু ফিরবে, তার জ্ঞান আসবে, আবার ‘হি হি’ করে হাসবে। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি তার সুস্থতার জন্য। আমরা যে অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষায় আছি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0