default-image

উৎসবে আসার একটাই শর্ত—এক কেজি বীজ নিলে পরের বছর তা চাষ করে অন্তত দুই কেজি ফেরত দিতে হবে। সারা দেশে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ধানের জাতকে ছড়িয়ে দিতেই বীজ বিনিময়ের এই ব্যতিক্রমী উৎসব। ছয় বছর ধরে আয়োজনটি হচ্ছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামে। লুপ্ত ধানের বীজ সংগ্রাহক ইউসুফ মোল্লা উৎসবের আয়োজক।

ইউসুফ মোল্লা নিখাদ চাষি। ২০১৩ সালে ধান সংরক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরিবেশ পদক গ্রহণ করেন। ৭৩ বছর বয়সী ইউসুফ মোল্লা তাঁর বীজের সংগ্রহশালার নাম দিয়েছেন ‘বরেন্দ্র কৃষিবীজ ব্যাংক’। বীজ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ বীজ বিনিময় উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এবার ২৬ জানুয়ারি ছিল উৎসব। এতে সহযোগিতা করে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক।

বিজ্ঞাপন
default-image

রাজশাহী শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরের নিভৃত গ্রাম দুবইল। গ্রামটির ৯০ শতাংশই মাটির বাড়িঘর। এখানেই ইউসুফ মোল্লার মাটির বাড়ি, ঘরের ভেতরেই বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে ৩১০ জাতের ধানের বীজ সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে জীবিত বীজ রয়েছে ২১৫টি এবং প্রদর্শনীর জন্য বীজ ব্যাংকে আছে ১০৫ জাতের ধানের বীজ। ব্যাংকটি বাড়ির বাইরে আলাদা একটা বাড়িতে করা হয়েছে। গত ছয় বছরে এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৬৫৮ জন চাষিকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ধানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।

এবারের উৎসবের স্লোগান ছিল ‘স্থানীয় বীজ রক্ষা করি, কৃষির ভিত মজবুত করি’। যাঁরা আগে এখান থেকে ধান নিয়েছিলেন, এ রকম ১৬০ জন কৃষক উপস্থিত থেকে অথবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে উৎসবে ধানের বীজ পাঠিয়েছেন। তবে এবার তিন রকমের পাহাড়ি জাতের ধান এসেছে, যেগুলো বীজ ব্যাংকে ছিল না। এ ধানগুলো চিকন এবং কালো রঙের। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে আসা তারেক আজিজ নামের এক ব্যক্তি এগুলো দিয়েছেন। এর মধ্যে এক জাতের নাম কালাপাহাড়।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চাষি মনিরুজ্জামান কালোভোগ, তানোরের রইচ উদ্দিন রাঁধুনিপাগল ও মোহনপুরের আবুল কালাম ঝিঙ্গাশাইল জাতের ধান নিয়ে উৎসবে এসেছিলেন। তাঁরা অনুষ্ঠানের অতিথিদের হাতে এ ধানবীজের ব্যাগ তুলে দেন। নীলফামারী থেকে কাটারিভোগ জাতের ধান পাঠিয়েছেন আহসান বাবু, বগুড়ার রেজাউল করিম পাঠিয়েছেন সুভা জাতের ধান—এ রকম আরও অনেকে ধান পাঠিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় জাতের ধান উৎপাদনে বিশেষ অবদান রাখার জন্য মনিরুজ্জামান ও রইস উদ্দিনকে সম্মাননা দেওয়া হয়।

আয়োজন সম্পর্কে ইউসুফ মোল্লা জানালেন, ইরি ধান আসার পর থেকেই তাঁর মনে হয়েছিল, দেশীয় ধানের জাত ফলনের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম এসব ধানের নাম জানতে পারবে না। তখন থেকেই তিনি দেশীয় ধানের জাত সংগ্রহ শুরু করেন। খবর পেলে সারা দিন হেঁটে গিয়েও ধান সংগ্রহ করেছেন। তাঁর অনুরোধ, তাঁর মৃত্যুর পরে এই বীজ ব্যাংক যেন কৃষকের কাছ থেকে হারিয়ে না যায়।

ইউসুফ মোল্লার সংগ্রহের ময়নাচিকন চালের ভাত, রানাভোগের ক্ষীর ও ঝিঙ্গাশাইলের পিঠাপুলি দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। অপ্রচলিত চালের রকমারি খাবারে যেন ধান উৎসবও পূর্ণতা পেয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন