default-image

ছোট্ট মেয়েটার নাম শ্রেয়া। সাভার সিটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। মিষ্টি করে হাসে। দুটি ভাই তার। বড় ভাই কিউ এম এ সাদিক আর ছোট ভাই কিউ এম এ সানাউল্লাহ। ‘কোন ভাইয়া তোমার বেশি প্রিয়? বড় ভাইয়া, না ছোট ভাইয়া?’ জিজ্ঞেস করলে খানিক গাঁইগুঁই করে উত্তর দেয়, ‘বড় ভাইয়া।’ মা শিরীন জাহান বললেন, ‘সে তো ছোটবেলা থেকে বড় ভাইয়ের কাছেই মানুষ। ভাই অফিস থেইকা না আসলে ভাত খায় না। ভাইয়ার সাথে ঘুমায়।’

২৪ এপ্রিল প্রতিদিনের মতোই স্কুলে গিয়েছিল শ্রেয়া। সেদিন ছুটি হওয়ার অনেক আগেই বাবা ওকে নিতে স্কুলে এসে হাজির। বাবার মুখে রাজ্যের অন্ধকার। শ্রেয়া জানল, সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে আটকা পড়েছে তার বড় ভাইয়াও।

মৃত্যুপুরী

রানা প্লাজার তিনতলায় অবস্থিত নিউওয়েভ বটম লিমিটেডের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক সাদিক। ২৪ এপ্রিল সকালে কর্মস্থলের দিকে যাওয়ার সময়ই কেন যেন তাঁর মনে হচ্ছিল, একটা খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। গার্মেন্টসের সদর দরজায় গিয়েও দেখেন একই অবস্থা। শ্রমিকেরা এক পা এগোন তো এক পা পেছান। কেউই ভেতরে ঢুকতে চাইছিলেন না। ভবনের পিলারে ফাটল ধরেছে বলে আগের দিন তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছে। এদিন দেখা গেল, ফাটল আরও বড় হয়েছে। তাই ভেতরে ঢুকতে এত ভয়। তবু চাকরি যাওয়ার ভয়ে একে একে সবাই ভেতরে ঢুকে পড়লেন, সঙ্গে সাদিকও।

‘তখন সম্ভবত পৌনে নয়টা বাজে। পেছনে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হইল সব মেশিন, সব মানুষ থেমে গেছে। পুরা বিল্ডিং কেঁপে উঠল। মাথার ওপরে ছাদগুলা মনে হইল একের পর এক ভেঙে পড়তেছে। সবাই গেটের দিকে ছুটল। সারি সারি মেশিনের মাঝখান দিয়ে আমিও ছুটলাম। পেছন থেকে একটা মেয়ে আমার হাত আঁকড়ায় ধরে বলল, “ভাই, আমারে নিয়া যান।” আমি বসে পড়লাম। তারপর দেখি সব অন্ধকার। মোবাইলের আলো জ্বালায় দেখলাম, দেড় ফুট উচ্চতার একটা জায়গায় কোনোমতে বসে আছি। মাথার ওপর ছাদটা ফেটে চৌচির হয়ে আছে। টোকা দিলেই মনে হয় ভেঙে পড়বে। কোনো রকম ছাদের বিমগুলার সঙ্গে আটকায় আছে। মোবাইলের আলোয় দেখলাম, চারিদিকে আটকা। ’ বলছিলেন সাদিক।

মৃত্যুপুরীতে শুরু হলো সাদিকের সুদীর্ঘ একেকটা মুহূর্ত। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মুঠোফোনের আলোটুকুই সম্বল। নেটওয়ার্কও নেই যে কাউকে ফোন করে সাহায্যের আবেদন করবেন। সোজা হয়ে বসার উপায় নেই। মেঝেতে ভাঙা কাচ, ভাঙা টাইলস, শুয়েও থাকা যায় না। চারদিক থেকে শোনা যাচ্ছে আর্তনাদ, গোঙানি। এমন সময় শুনতে পেলেন ড্রিল মেশিনের শব্দ। একটু সাহস হলো। যাক, উদ্ধার হওয়ার আশা আছে। সাদিক তখনো জানেন না, তাঁকে এই মৃত্যুপুরীতে আটকে থাকতে হবে আরও ১০০ ঘণ্টা।

default-image

পানি!

কতক্ষণ কেটে গেছে, সাদিক জানেন না। বাইরে দিন না রাত, তা-ও জানেন না। উদ্ধারকারীদের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে। চিৎকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন, কেউ শুনতে পায়নি। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে রক্তের স্রোত। কাছেই কোথাও একটা বাথরুম ভেঙে আছে। সেখান থেকে ময়লা পানি এসে সারা শরীর মাখামাখি। তীব্র দুর্গন্ধ। এতসবের মাঝেও তখন সাদিকের প্রয়োজন শুধু একটুখানি পানি। শুয়ে শুয়ে একটু এদিক-ওদিক যাওয়া যায়। চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে দুটো পানির বোতল পাওয়া গেল। ভেতরে অল্প পানি। সেই পানিটুকু দিয়েই তিনি একটু গলা ভেজালেন। পিলারের ওপাশে আরও দুজন বেঁচে ছিলেন। মাঝে মাঝে তাঁদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আশপাশেই শোনা যাচ্ছিল আরও অনেক মানুষের আহাজারি, চিৎকার।

‘একজন পানির অভাবে একসময় নিজের হাত ছেঁইচা চুইষা চুইষা রক্ত খাওয়া শুরু করল। আরেকজনের পা আটকায় গেছে। ইট দিয়া ছেঁইচা ছেঁইচা নিজের পা বাইর করতেছিল। আমি শুধু দোয়া-দরুদ পড়ছি, আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছি। একসময় সবাই চুপ হয়া গেল। আমি একাই চিৎকার করতেছিলাম। ইট দিয়ে টিনের গায়ে বাড়ি দিতেছিলাম।’ বলছিলেন সাদিক।

ভেতরে মানুষ আছে!

সাদিক তখন ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। বাবা, মা, ভাই, বোন সবার কথা মনে পড়ছে। আর বোধ হয় বেঁচে ফেরা হলো না। এমন সময় শুনতে পেলেন খুব কাছেই উদ্ধারকারীদের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সাদিক প্রাণপণ টিনের গায়ে ইট দিয়ে বাড়ি দিতে থাকলেন। নিচ থেকে তাঁর কথা ওপরে যাচ্ছিল না, কিন্তু ওপরের কথা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। একসময় উদ্ধারকারীরা বুঝতে পারলেন, ভেতরে লোক আছে! তবু, উদ্ধারকারীদের সাদিকের কাছাকাছি পৌঁছাতে আরও অনেক সময় লাগল। ভবনধসের পর তত দিনে চার দিন পেরিয়ে গেছে। অবশেষে একসময় সাদিক পিলারের ওপাশ থেকে শুনতে পেলেন, ‘আপনারা ভেতরে কয়জন আছেন?’ সামান্য একটা কথা কী যে মধুর শোনাল!

তৃতীয় তলায় যাঁরা বেঁচে ছিলেন, সবাই চিৎকার করতে লাগলেন। উদ্ধারকারীরা এক এক করে সবাইকে উদ্ধার করতে শুরু করলেন। শুধু সাদিক আর সেই মেয়েটি এমন বেকায়দাভাবে আটকে পড়েছেন, চারদিকে মোটা স্তম্ভ। সহজে তাঁদের কাছে পৌঁছানোর উপায় নেই।

দুঃসহ সময়গুলোর কথা বলছিলেন সাদিক, ‘তারা ড্রিল মেশিন দিয়ে পিলারে গর্ত করা শুরু করল। যেকোনো সময় আগুন লেগে যাওয়ার ভয় ছিল। একসময় মোটামুটি একটা গর্ত হইল। আমাদের পানি দিল। পানি খেয়ে অনেকটা শক্তি পাইলাম।  মেয়েটাকে ওরা টেনে বের করে নিল। কিন্তু আমারে আর বাইর করতে পারে না। অনেক টানাটানি করছে, বুকের কাছে আটকায় যায়। কাপড় খুলে সারা গায়ে তেল মাখলাম, তবু বের করা যায় না। ভেতরে অক্সিজেন এত কম, উদ্ধারকারীরাই একটু পরপর বেহুঁশ হইয়া যাইতেছিল। আমি যে কীভাবে বাইচা ছিলাম, জানি না। খোদার অশেষ রহমত। একসময় তারা চেষ্টা করতে করতে হাল ছেড়ে দিল। একজন আমাকে একটা ছেনি আর একটা হাতুড়ি দিয়ে চলে গেল। বলে গেল: আমরা তো পারতেছি না। আপনি একটু একটু করে চেষ্টা করতে থাকেন।’ সাদিক চেষ্টা করলেন। কিন্তু দুর্বল হাত কিছুতেই চলে না। পিলার ভেঙে বের করার চেষ্টা ব্যর্থ হলো।

কিন্তু রাজু নামের এক উদ্ধারকর্মী হাল ছাড়লেন না। তিনি ছাদ ভেঙে একটা ফোকর তৈরি করলেন। অবশেষে সাদিকের বের হওয়ার পথ হলো। ‘আমি বললাম, আমার গায়ে তো কাপড় নাই, আমারে একটা জামা দেন। তারা আমাকে একটা লাল গেঞ্জি দিল। সেইটা গায়ে দিলাম।’ বলছিলেন সাদিক।

আশা-নিরাশা

বাবা কাজী আহসান পাঁচ দিন ধরে ছোটাছুটি করছেন। একবার অধরচন্দ্র স্কুলে যান, আবার যান রানা প্লাজার কাছে। বাবার মন। ছেলে বেঁচে আছে, এই আশাটা কখনোই হারাননি। হঠাৎ খবর পেলেন, সাদিক নামের একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাবা কাছে যেতে না যেতে ততক্ষণে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাদিকের চাচাতো ভাই তুহিন উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি বললেন, ‘চাচা, আমি দেখছি। কিন্তু যারে উদ্ধার করা হইছে, তার গায়ে তো লাল গেঞ্জি। সাদিকের পোশাকের সাথে মিলে না।’ এর মধ্যে মাইকে ঘোষণা শুরু হলো, সাদিক নামের আরেকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত অবস্থায়। তাঁকে অধরচন্দ্র স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহসানের যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আশা-নিরাশার এই দোটানা তিনি আর নিতে পারছিলেন না। কোথায় যাবেন? হাসপাতাল, নাকি অধরচন্দ্র স্কুল?

এর মধ্যে উদ্ধারকর্মীদের একজনকে ছেলের ছবি দেখালেন। তিনি বললেন, ‘চাচা, আপনি এখানে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করবেন না। হাসপাতালে যান।’

কাজী আহসান হাসপাতালে ছুটলেন। নিবিড় পর্যবেক্ষণ রুমের দরজার এপাশ থেকে দেখলেন, হ্যাঁ, ওই তো সাদিক! তাঁর ছেলে!!

নতুন জীবন

সাদিক এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন। পায়ের তিনটা হাড় ফেটে গেছে, সেখানে ব্যান্ডেজ আছে। ডাক্তার বলেছেন, শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবেন। সাদিক বললেন, আর কখনো পোশাক কারখানায় চাকরি করবেন না। সুস্থ হলে অন্য কোনো চাকরিতে ঢুকবেন।

পুরো পরিবারের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ধকল গেছে। মা অসুস্থ শরীর নিয়েও রান্নায় ব্যস্ত। সাদিককে দেখতে চারদিক থেকে স্বজনেরা আসছেন। ছোট ভাই সানাউল্লাহ তাঁদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। সাদিকের বাবা বললেন, ‘পরিচিত-অপরিচিত সবাই অনেক দোয়া করছে। সবার দোয়া ছিল বলেই আমার ছেলেরে ফিরে পাইছি।’

ছবি তোলার জন্য আমরা পরিবারের সবাইকে একত্রে করলাম। তিনজনের সোফাতেই পাঁচজন গাদাগাদি করে বসলেন। শ্রেয়া ঠিকই বড় ভাইয়ার পাশের জায়গাটা দখল করে নিল। সাদিক অবশ্য শ্রেয়াকে কোলে নিয়েই বসতে চাচ্ছিলেন। শ্রেয়া রাজি হলো না। ভাঙা পা নিয়ে ভাইয়া তাকে কোলে নেবে, তাই কি হয়? ভাইয়ার কষ্ট হবে না?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন