default-image

বেলা ১১টার মতো বাজে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে গিয়ে এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, দেবেন্দ্র দাস লেন কোনটা?’ একজন বললেন, ‘সোজা চলে যান।’ সামনে গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘দেবেন্দ্র দাস লেন কোনটা?’ সবাই শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। শেষে উত্তর মিলল একজন পথচারীর কথায়, ‘সামনে যান, সেখানে এ টি এম গলি পাবেন। ওটাই আসলে দেবেন্দ্র দাস লেন।’ সিটি করপোরেশনের দেওয়া নাম ঢাকা পড়ে গলির নাম কোনো এক ফাঁকে এ টি এম গলি হয়ে গেছে! সরু গলির একটুখানি ভেতরে দোতলা একটি পুরোনো আমলের বাড়ি। সেখানেই থাকেন এ টি এম শামসুজ্জামান; যাঁর পরিচিতির দাপটে বিলীন হয়ে গেছে গলির পুরোনো নাম। যে মানুষটির কারণে এ নাম তাঁর অবশ্য সেসবে আগ্রহ নেই মোটেও। ঘরের বৈঠকখানা জুড়ে গদি পাতা। নামের প্রসঙ্গ তুলতেই গদিতে বসা মানুষটা বললেন, ‘আমি এত সম্মান পাওয়ার যোগ্য নই। যখন নিজে এ কথা শুনেছি, তখন বলেছি, তোমরা আমাকে ভালোবাস, ভালো কথা। কিন্তু এত ওপরে উঠিও না। কারণ, ওটা আমার জায়গা নয়।’

বিজ্ঞাপন
default-image

এক টুকরো শৈশব

নোয়াখালীতে নানাবাড়ি। সেখানেই তাঁর জন্ম। ৪০ দিনের মাথায় নানাবাড়ি থেকে এ টি এমকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। তখনকার ঢাকা বলতে আজকের পুরান ঢাকা। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। বাবা পেশায় আইনজীবী। আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। ছেলেবেলাতেই নানা রকম গান-বাজনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তাঁরাই ছিলেন একমাত্র মুসলমান পরিবার। পিসি, মাসি, ঠাকুরমা—তাঁদের সঙ্গেই দিন কেটে যায় তাঁর। একসময় স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো এ টি এমকে। পড়াশোনায় একদম মনোযোগ নেই তাঁর। বড় চাচা ড. সিরাজুল হক এ টি এমকে নিয়ে গেলেন রাজশাহীতে। সেখানে লোকনাথ স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। চাচা বিয়ে করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বড় মেয়েকে। সেই সূত্রে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে তিনি নানা বলে ডাকেন। লোকনাথ স্কুলে পড়ার সময় মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সান্নিধ্য পান। সেই ছোটবেলায় দারুণ ভাব হয়ে গিয়েছিল তাঁর সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছিলেন—আমলকী খাওয়ার পর পানি খেলে বিনে পয়সায় শরবত খাওয়া হয়। শিশু এ টি এম একবার নানাকে জব্দ করার জন্যই প্রশ্ন করেছিলেন—‘আচ্ছা, নানা, আপনি এতগুলো সন্তান নিয়েছেন কেন?’

নানার জবাব, ‘আমি একজন রবীন্দ্রনাথের অপেক্ষায় আছি।’ শুনে নাতির মুখ চুন।

স্কুলজীবনের এ টি এমের বন্ধু ছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। তখন তিনি শিল্পী রফিকুন নবী হয়ে ওঠেননি। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় রফিকুন নবী বলতেন, ‘খোকন, কাল স্কুলে আসার সময় মাথায় বেশি করে তেল দিয়ে আসিস।’ এ টি এম তেল দিয়ে স্কুলে আসতেন। খাতার সাদা পাতা নিয়ে রফিকুন নবী এ টি এমের তেল-মাথায় ঘষে নিতেন। তারপর ওই পাতা কোনো কিছুর ওপর রেখে ছবি আঁকাআঁকি চলত ইচ্ছেমতো। ‘আমার বন্ধু রফিকুন নবী, সবাই যাঁকে চেনে রনবী নামে। সে আজ মস্ত বড় শিল্পী, এটি আমার অনেক গর্ব।’ বলছিলেন এ টি এম।

চাচা রাজশাহী থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহে চলে গেলেন। তাই রাজশাহীর লোকনাথ স্কুল ছাড়তে হলো এ টি এমকে। চাচার সঙ্গেই যেতে হলো ময়মনসিংহে। সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে ঢাকা ফিরলেন। ঢাকায় এসে তিনি ভর্তি হলেন জগন্নাথ কলেজে।

default-image

রুপালি দুনিয়ার হাতছানি

পাড়ায় হরহামেশা নাটক হয়। নাটকের মহড়া দেখতে অনেক মানুষ ভিড় করে। কিন্তু ঢোকার সুযোগ পান না এ টি এম। শেষে একদিন বুদ্ধি করে নাটকের শিল্পীদের চা খাওয়ানোর কথা বলে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকে পড়লেন মহড়াকক্ষে। ‘ঢুকে দেখি এলাহি কারবার। কেউ হাসে তো কেউ কান্দে। আবার কেউ চিৎকার করে কথা বলে। আবার একজন জোরে জোরে সংলাপ বলে দেয়। দেখে আমি নাটকের প্রেমে পড়ে গেলাম। পরদিন থেকে চা খাওয়ানোর জন্য আমি যেতে শুরু করলাম। একদিন এক কাণ্ড হলো। দেখি, প্রম্পটার আসেননি। মহা হইচই। আমি সাহস করে নাটকের দলনেতাকে বললাম, আজ্ঞে, আমি কি কাজটা করতে পারি? দলনেতা হ্যাঁ-না কিছুই বলেন না। আমি নাটকের চিত্রনাট্য নিয়ে জোরে জোরে প্রম্পটারের কাজ শুরু করলাম। ব্যস। এভাবেই হয়ে গেলাম নাটকের একজন।’ বলছিলেন সে সময়কার কথা।

কিন্তু এ টি এম শামসুজ্জামানের বাবা খুব রাগ করলেন। তাঁর স্বপ্ন, ছেলেকে তিনি আইনজীবী বানাবেন। কিন্তু ওই পেশা ছেলের পছন্দ নয়। তাই তিনি মাকে বললেন, তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে না। তবে বাবার সামনে এসব কথা বলার সাহস দেখালেন না। এভাবে নাটকের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন। একদিন বন্ধু লতিফ এসে খবর দিল, ‘কলকাতা থেকে অনেক বড় একজন পরিচালক এসেছেন। নাম উদয়ন চৌধুরী। তুই চল। সহকারী হিসেবে তোকে আমি সেখানে ঢুকিয়ে দেব।’ ‘সিনেমার সহকারী পরিচালক! শুনে তো সেদিন রাতে আমার আর ঘুম আসে না। পরদিন সকালবেলা গেলাম উদয়ন চৌধুরীর কাছে। তিনি স্যার বলে সম্বোধন শুনতে পছন্দ করতেন। লতিফ বললেন, “স্যার, আপনাকে একটি ছেলের কথা বলেছিলাম। ও সেই ছেলেটি। ” উদয়ন চৌধুরী বললেন, “হ্যাঁ, এসো এসো বলেই একটি সাদা কাগজ আর কলম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার নাম-ঠিকানা লেখো। ” আমি লিখলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি আমার নাম-ঠিকানা দেখে বললেন, “তোমার হাতের লেখা তো ভালো। বলেই আলমারি খুলে ৫০০ পৃষ্ঠার একটি পাণ্ডুলিপি হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এটি খুব তাড়াতাড়ি তিনটি কপি করবে”।’

বিজ্ঞাপন

এ টি এম রাত জেগে খেটেখুটে যত্ন করে ১২ দিনের মধ্যেই তিনটি কপি করে পাণ্ডুলিপি দিলেন। স্যার মূল পাণ্ডুলিপির সঙ্গে তাঁর লেখা পাণ্ডুলিপিটি মেলালেন লাইন ধরে ধরে। বললেন, ‘দারুণ হয়েছে। খুব ভালো করেছ।’ তারপর তিনটি পাণ্ডুলিপিই তিনি ময়লার বাক্সে ছুড়ে ফেলে দিলেন। এ টি এম অবাক। এ কী করছেন, স্যার। স্যার বললেন, ‘এসবের আর দরকার নেই আমার। আসলে আমি তোমার ধৈর্যশক্তির পরীক্ষা নিতে চেয়েছি। তুমি সে পরীক্ষায় পাস করেছ। তুমি এখন থেকে আমার তিন নম্বর সহকারী।’

এভাবেই এ টি এম শামসুজ্জামান চলচ্চিত্র অঙ্গনে আনাগোনা শুরু করেন। কদিন পরই শুনলেন বিষকন্যা নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন উদয়ন চৌধুরী। তাঁকে যেতে হবে সেখানে। এ টি এম পুরোপুরি প্রস্ত্তত। কিন্তু তাঁর বাবা জেনে রেগে গেলেন এবং গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। তাতে এ টি এমের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। তিনি তাঁর কাপড়চোপড় নিয়ে চলে গেলেন পাশের বাড়িতে। সেখান থেকে সোজা উদয়ন চৌধুরীর কাছে। পরে তিনি রওনা হলেন মানিকগঞ্জের উদ্দেশে।

‘আমার ধারণা ছিল, সহকারী মানে আমি স্যারের সঙ্গে সঙ্গে থাকব। কিন্তু এ কী! আমার দায়িত্ব পড়ল বেদেকন্যাদের দেখাশোনার। শুটিংয়ের দিন বেদেনীরা তাঁদের স্যান্ডেল একটি বটগাছের নিচে রেখে গেলেন। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, ওই স্যান্ডেলগুলো কুড়িয়ে এনে পাহারা দেওয়া এবং কাজ শেষে বেদেনীদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া। আর রাতে বেদেনীদের একটি ঘরে রেখে দরজা তালা দিয়ে পাশেই বসে থাকা। মনে মনে ভাবলাম, এটাও বোধ হয় স্যার এক ধরনের পরীক্ষা নিচ্ছেন। পরদিন আমার একটু প্রমোশন হলো। স্যার আমাকে ডাকলেন। বললেন, “আমার পাণ্ডুলিপিটা ধরো। এখন থেকে সঙ্গে সঙ্গে থাকবা। ” আমার মনে তো আর আনন্দ ধরে না। তখন থেকে স্যার দৌড়ান, সঙ্গে আমিও দৌড়াই। স্যার বসলে আমি মাথায় ছাতা ধরি। তবুও শান্তি যে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্যান্ডেল পাহারা দিতে হলো না।’ পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে এ টি এম নিজেই গলা কাঁপিয়ে হাসেন। চিরচেনা সেই হাসি।

default-image

ছবির কাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরে এলেন এ টি এম শামসুজ্জামান। যে কটি টাকা পেলেন, তা দিয়ে অন্যের বাড়িতে ভালোভাবেই দিন কাটাতে লাগলেন। মাঝেমধ্যে বাবার অনুপস্থিতিতে এ টি এম বাড়িতে আসেন। মা, ভাই ও বোনেরা কী যে খুশি হয়। এ টি এমের মা আবার সিনেমা-পাগল ছিলেন। সে সময়ের নায়ক অশোক কুমারের ভক্ত ছিলেন তাঁর মা। এ টি এমের মা মনে করতেন, ভারতের সিনেমা আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিনেমা একই। মনে মনে ভাবতেন, ছেলে তাঁর প্রিয় নায়কের সঙ্গেই কাজ করেন। একদিন এ টি এমকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই অশোক কেমন আছেরে?’ এ টি এমও ভালো মানুষটির মতো মুখে ভাত দিয়ে বলেন, ভালো আছে। মা শুনে খুশি হন। এ টি এম মনে মনে হাসেন। কী দরকার মাকে অত কিছু বোঝাতে গিয়ে বিপদে পড়ার।

‘তখন থেকে আমি নিয়মিত সিনেমায় কাজ করার জন্য স্টুডিওতে ঘোরাঘুরি করি। মুশকিল হলো, ছবির কাজে আর কেউ ডাকে না। একদিন এফডিসি দিয়ে হাঁটছিলাম। একজন এসে বলল, “এই খোকন, এদিকে আয় তো। ” কেন? “আরে, একজন শিল্পীর আসার কথা ছিল, আসেনি, তুই কাজটা কর। কয়টা পয়সা পাবি। ” আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। আধা ঘণ্টার কাজ করলাম। বিরক্ত হয়ে বললাম, ভাই, এরপর আর এসব করতে বলবেন না। আমি অভিনেতা না। কিন্তু তাতে কেউ কি আর কথা শোনে। এরপর দেখা গেল, যখনই কোনো শিল্পী অনুপস্থিত, সেখানেই যেন আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। এভাবে কয়েকটা ছবিতে টুকটাক করে কাজও করলাম।’ বলে চলেন এ টি এম শামসুজ্জামান।

‘আচমকা একদিন একজন এসে খবর দিল, আমজাদ হোসেন নাকি আমাকে দেখা করতে বলেছেন। খুশি হয়েই গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, “নতুন একটি ছবি বানাব। ছবির নাম নয়নমণি। আপনি মোড়লের চরিত্রে কাজটা করবেন। ” শুনে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। বললাম, ভাই, আমার চেহারাটা না-হয় ভালো না, তাই বলে ভরা মজলিসে মশকরা করেন কেন? আমজাদ হোসেন বলেন, “আরে ভাই, আমি তো আপনাকে নেওয়ার জন্যই বলছি। ” তিনি ছবির গল্প বলা শুরু করে দিলেন। আজও ভেবে পাই না যে কী মনে করে আমি রাজি হয়েছিলাম।’ এরপর ছবি মুক্তি পেল। চারদিকে এ টি এমের নাম ছড়াতে শুরু করল। কিন্তু তখনো এ টি এম তাঁর বাবার সামনে যেতে পারেন না। এর মধ্যেই একদিন জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে তলব এল এ টি এমের বাবার কাছে। তাঁকে এখনই যেতে হবে। জেলা ও দায়রা জজ সাহেব এ টি এমের বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এ টি এমের বাবা ছুটে গেলেন। জজ সাহেব এ টি এমের বাবাকে প্রশ্ন করলেন।

—আপনার একটি ছেলে আছে না?

—কেন, স্যার?

—ও কী ধরাটরা পড়ছে কোথাও।

—(বাবার মনে শঙ্কা) আমার কথা শোনে না, স্যার। কী করব, বলেন?

জজ সাহেব হাসেন, ‘আরে না। আপনার ছেলে তো অসাধারণ অভিনয় করে। আপনার ছেলে মোড়লের চরিত্রে যা অভিনয় করেছে না...।’

(এ টি এমের বাবার কাছে জজ সাহেবের কথা ভালো লাগে না)।

—এসব বলার জন্য ডেকেছেন আমাকে, স্যার। আমি এসব অভিনয় পছন্দ করি না।

এরপর তিনি রেগেমেগে চলে আসেন।

‘বাবা অনেক পরে আমাকে বললেন, তোর অভিনয় দেখে জজ সাহেব অনেক প্রশংসা করেছিলেন। আসলে বাবা আস্তে আস্তে অভিনয় করার বিষয়টি মেনে নিতে শুরু করেন।’ বলছিলেন এ টি এম। কিছুদিন বাদে বিয়ে করলেন। সেটা ১৯৬৮ সালে। বাবা গিয়ে বউ ঘরে তুলে আনেন। তারপর অভিনয় আর অভিনয়। পরিচালনা করাটা আর হলো না।

বিজ্ঞাপন
default-image

সিনেমার মানুষ

চার শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন এ টি এম শামসুজ্জামান। অভিনয়জীবনে আছে তাঁর অনেক ঘটনা। ভালো-মন্দ দুই ধরনের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন তিনি। মন্দ চরিত্রে অভিনয় এমনভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতো যে মাঝেমধ্যে তাঁকে বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। যেমন, একবার মানিকগঞ্জের ঝিটকায় গিয়েছেন শুটিং করতে। সঙ্গে রাজ্জাক। সেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছেন হাঁটাহাঁটি করতে। নদীর কাছাকাছি যেতেই এক নারীকে দেখা গেল পানি নিয়ে আসছেন। এ টি এমকে দেখেই ওই নারী চিৎকার করে বললেন, ‘মাগো, সহাল সহাল বেডা বদমাইশটার মুখটা দেখলাম। এই বেডা, এই হানে কী চাও। আইজকা দিনডাই আমার খারাপ যাইব।’ একটু পরই রাজ্জাক সেখানে হাজির। রাজ্জাককে দেখে ওই নারী সালাম দিলেন। ‘আরে আপনি, এখানে। তা আপনি এই বদমাইশের সঙ্গে এই হানে আইছেন কেন।’ এ টি এম ওই নারীর কথা শুনে হাসেন। আর নারী আরও বেশি খেপে যান।

এ রকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল এ টি এম শামসুজ্জামানের জীবনে। তাঁর মুখেই শুনুন—‘ঢাকার বাইরে গেছি শুটিংয়ে। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে যাব। মসজিদের কাছে এক লোক আমার হাত ধরে টেনে বললেন, “ভাই, যে খারাপ মানুষ আপনি, আর যে অকাম করছেন জীবনে, এহনো সময় আছে ভালো হইয়া যান। আর এদিকে কই যান। আপনার মতো পাপী মানুষ এদিকে যাইয়া আমাগো পাপী বানাইবেন না। ” আমি তখন বোকা বনে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ।’

আবার উল্টো ঘটনাও আছে। একবার এক ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল—এ টি এম ববিতাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন। ছবিটি মুক্তির পর এ টি এম গেলেন চট্টগ্রামে। সেখানে তাঁকে দেখার পর এক ছেলে এসে হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, ‘ভাই, আপনারে যে আমি কেমনে খুশি করব। আপনি তো আমার জানরে বাঁচাইছেন।’ পরে এ টি এম বুঝতে পারেন যে ছেলেটি ববিতার অন্ধভক্ত।

অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে এ টি এম শামসুজ্জামান নির্মাণ করেছিলেন এবাদত ছবিটি। কিন্তু এই ছবিটি নিয়ে সেন্সর বোর্ডের আচরণে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। ‘ছবিটিতে এমনভাবে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে যে মুক্তির পর সিনেমা হলে গিয়ে নিজের ছবি আর নিজেই চিনতে পারি না। এরপর ছবি বানানোর চিন্তাও ছেড়ে দিয়েছি।’

এ রকম ছোট-বড় অপূর্ণতা আছে অনেক। কিন্তু সেসবের কোনো কিছু নিয়েই খুব বেশি মাথাব্যথা নেই তাঁর। এ টি এম শামসুজ্জামান থাকতে চান নিজের মতো। কাটাতে চান বিত্তবৈভবের বাহাদুরিবিহীন সাধারণ সুখী মানুষের জীবন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন। আশ্চর্য হলেও সত্যি, এখন পর্যন্ত কোনো দিন নিজের দামি গাড়িতে চড়তে দেখা যায়নি তাঁকে। এখনো তাঁকে চলাফেরা করতে হয় রিকশা, অটোরিকশা, নয়তো পাবলিক বাসে। কখনো বা শুটিং ইউনিটের গাড়িতে। রুপালি পর্দায় দেখা যায়, কত শানশওকত তাঁর। দামি দামি কাপড়চোপড় পরেন তিনি। অথচ বাস্তবে তার উল্টো।

আজ ৭০ বছর (২০১০) পার করেও তিনি অভিনয় করছেন। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তিনি একান্নবর্তী পরিবারেই আছেন। নিজের কাছে এর ব্যাখ্যাও আছে তাঁর।

‘আসলে ওই সবই রুপালি পর্দার। বাস্তবে আমি তাঁর উল্টো। ওই যে সাদা ফতুয়া দেখছেন, ওটাই আমার কাপড়। এই যে বাড়িটা দেখছেন, এটা আমার বাবা মরহুম হাজি নুরুজ্জামান খানের। তিনি আমাকে নিচতলাটা দিয়েছিলেন। তাতেই আমার অনেক সন্তুষ্টি। আমি ওপরওয়ালাকে বলি, কত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, আর আমি কত আরামে আছি, দুবেলা অন্তত দুটো লোকমা মুখে দিতে পারছি, এর চাইতে বড় শান্তি আর কী হতে পারে? বাড়ি করার বা গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, তাই হয়নি। কারণ, আমার তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে বড় করতে হয়েছে। ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। এটাই আমার শান্তি।’ বললেন এ টি এম শামসুজ্জামান। এমন সাদাসিধে আর সহজ-সরল মানুষটিকেই বাংলাদেশের দর্শক প্রায় চিরকাল দেখে এসেছে অসৎ আর কুচক্রী মানুষের ভূমিকায়। অভিনেতা আর কাকে বলে!

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন