বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেলা তিনটার দিকে আচমকা ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। এমন তো হওয়ার কথা নয়। ঘাট ছাড়ার আগে খুঁটিনাটি সব দেখে উঠেছি। সাগরে নোঙর ফেলি। প্রায় ২৭৩ হাত পানি (দড়ি দিয়ে আমরা গভীরতা মাপি, যাকে বলে ‘বাম’। এক বাম সমান সাড়ে তিন হাত)। এর মধ্যে ঢেউ বাড়তে থাকে, বাতাসও বাড়ে। জাল ফেলে উত্তাল সাগরে ট্রলার রক্ষার চেষ্টা করে সঙ্গীরা। আমি ইঞ্জিন সারাইয়ের চেষ্টা করতে থাকি। দিন রাত হয়ে যায়, কিন্তু ইঞ্জিন ঠিক হয় না। সবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। দিনটা ছিল ৯ ডিসেম্বর।

ভিনদেশে আমরা

ট্রলারে বসে থাকতে থাকতেই উত্তরের বাতাস বেগ পায়। নোঙর তুলে ফেলি। দক্ষিণ দিকে ভেসে যেতে থাকে ট্রলার। সঙ্গে পাল ছিল না। কম্বলই ভরসা। তা দিয়েই পাল বানানো হলো। ধরাধরি করে পাল ওড়ালাম। চলতে থাকল ট্রলার। কোনো দ্বীপ বা চরের সন্ধান পাব, এই আশায় বুক বাঁধলাম।

এক দিন, দুই দিন করে কেটে গেল কয়েক দিন। ভাসতে ভাসতে কোথায় আছি, জানি না। সাগর তখন স্থির। এত দিনে কূলকিনারা তো দূরে থাক, কোনো জাহাজ-ট্রলারেরও দেখা পেলাম না। খাবারও ফুরিয়ে আসছে। সবার মধ্যে মৃত্যুভয় ঢুকে গেল।

default-image

এক রাতে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করল। তড়িঘড়ি উঠে আবার পাল উড়িয়ে দেওয়া হলো। অজানা পথে চলতে থাকল আমাদের ট্রলার। রাত পেরিয়ে সকাল হলো। সামান্য চাল ছাড়া আর কিছুই নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম, দিনে এক কেজি চালের ভাত রান্না করব। এক কেজি চালের ভাত খাব ২০ জন মানুষ! অন্য বেলা এই ভাতের মাড় খাওয়া হবে। খাওয়ার পানিও নেই। কদিন ধরে মাছ সংরক্ষণের জন্য আনা বরফ খাচ্ছি।

হঠাৎ দূরে কিছু একটা দেখতে পেলাম। বড়শি বাওয়া একটা জাহাজ ধীরে ধীরে আমাদের কাছাকাছি এল। দেখে মনে হলো ভারতীয় জাহাজ। তার মানে আমরা আর দেশের সীমায় নেই।

জাহাজের লোকদের করজোড়ে কত কাকুতি-মিনতি করলাম। বললাম, আমাদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল। অনেক দিন সাগরে ভাসছি। আমাদের চাল নেই, খাওয়ার পানি নেই। কিন্তু তারা কী ভাবল কে জানে, কোনো কথাই বলল না। জাহাজ ঘুরিয়ে চলে গেল।

জাহাজটা দেখে বাঁচার যে ক্ষীণ আশাটুকু তৈরি হয়েছিল, সেটুকুও মিলিয়ে গেল। কান্নাকাটি শুরু করল সবাই।

default-image

শেষ চেষ্টা

সাগরে তত দিনে ১৫ দিন কেটে গেছে। মনে হচ্ছিল ট্রলারেও পানি উঠতে শুরু করেছে। রাত গভীর হলে সবার মধ্যে মৃত্যুভয় আরও প্রকট হলো। কান্না জুড়ে দিল কেউ কেউ। সকাল দেখতে পাব কি না, কে জানে—একে অন্যের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিলাম। তাবিজ, আংটি—যার শরীরে যা কিছু ছিল, সবাই সবকিছু খুলে সাগরে ফেলে দিল। মারা গেলে এসব পরে থাকতে নেই। ট্রলারে যা মাছ ছিল, তা-ও ফেলে দেওয়া হলো।

আহাজারির মধ্যেই ভোর হলো। দিনের আলোয় কিছুটা সাহস পেল যেন সবাই। ঠিক হলো শেষ চেষ্টা করে দেখব। ট্রলারে আমাদের থাকার যে চেম্বার ছিল, সেখানকার তক্তা দিয়ে বইঠা বানালাম। আবার কম্বলের পাল ওড়ালাম। পাঁচজন করে বইঠা বাইতে থাকলাম।

তিন দিন দুই রাত বইঠা বেয়ে যেখানে পৌঁছালাম, মনে হলো সেখানে পানির গভীরতা কিছুটা কম। পরিমাপ করে দেখলাম, ধারণা সত্যি। ৬০ হাতের মতো পানি। বুঝলাম, তীরের দিকে এসেছি আমরা। সবাই একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার পাল ওড়ালাম। শুরু করলাম দাঁড় বাওয়া। তখন কেমন যেন একটা আশা পাচ্ছিলাম। নোঙর ফেললাম।

default-image

কসময় ভারতের দুটি ট্রলিং জাহাজের দেখা পেলাম। অনেক অনুরোধের পর আমাদের কাছে এল একটি জাহাজ। আমরা বিপদের কথা তাদের বললাম। তারা উত্তর-পূর্ব দিকে যেতে বলল। সেদিকেই তীর।

সেদিন ছিল ২৬ ডিসেম্বর। আবার দাঁড় বাইতে থাকলাম। কয়েক দিন পেটে তেমন খাবার পড়েনি। সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত। তবু মনের জোরে দাঁড় বাইতে থাকলাম। একদিন পর তীর দেখতে পেলাম। কাছাকাছি যেতেই দুটি নৌকা আমাদের সহায়তা করল। ট্রলার টেনে তীরে ভেড়াল। তখন জানলাম, জায়গাটা ভারতের ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর।

বেঁচে ফেরা

বন্দরে নেমে সবই কাঁদতে শুরু করল। আমরা যে আবার মাটিতে পা রাখতে পারব, এই বিশ্বাস আমাদের ছিল না। আমাদের ভারতের কোস্টগার্ডের কাছে নেওয়া হলো। সব শুনে, তল্লাশি করে তারা নিশ্চিত হলো, সত্যিই বিপদে পড়েছি। পরের ১২টি দিন আমরা সেখানেই ছিলাম। পারাদ্বীপ বন্দর থানার তত্ত্বাবধানে আমাদের রাখা হয়েছিল। আমাদের ট্রলারের ইঞ্জিনটা তারা ঠিক করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনোভাবেই ঠিক করা যায়নি।

৭ ডিসেম্বর। বাড়ি ছাড়ার এক মাস পর ভারতীয় কোস্টগার্ডের সঙ্গে আমরা বাড়ির পথ ধরি। তাদের একটি জাহাজের সঙ্গে আমাদের ট্রলারটি বাঁধা। ভাসতে ভাসতে ৯ জানুয়ারি বেলা ১১টায় বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের কাছে আমাদের হস্তান্তর করা হয়। ১০ জানুয়ারি আমাদের মোংলা বন্দরে আনে কোস্টগার্ড। ১৪ জানুয়ারি বাড়ি ফিরি।

সাগরে ৩৭ বছর ধরে মাছ ধরি। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝায় পড়েছি। একজীবনে এই অতল দরিয়ার কত যে রূপ দেখেছি, বলে শেষ করা যাবে না। তবে এবারের যাত্রায় বেঁচে ফেরা, স্ত্রী-সন্তানদের মুখ দেখতে পারা এখনো অবিশ্বাস্য লাগে । এ যে নতুন জীবন পাওয়া।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন