default-image

রাকিবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে আশাহত হলাম। কারণ, রাকিব বাস্তবে ইউটিউবের জন্য তাঁর তৈরি ভিডিওর মতো করে কথা বলেন না। তবে রাকিবের সঙ্গে আড্ডার পরবর্তী অংশ জমেছিল বেশ। বলছি আরএনএআর নামের ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও নির্মাতা রাশেদুজ্জামানের কথা। ইউটিউবার রাকিব নামেই যিনি সবার কাছে পরিচিত।

মজার ছলে বাংলা সিনেমার পর্যালোচনা করে ইউটিউবে ভিডিও বানান রাকিব। ভিডিওতে তাঁর ব্যতিক্রমী কথা বলার ভঙ্গি দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। লাখ লাখ মানুষ দেখেন রাকিবের ভিডিও। সিনেমাকে ভিত্তি করেই প্রতিটি ভিডিও বানান তিনি। বিনোদনের পাশাপাশি রাকিবের ভিডিওতে সিনেমার তথ্য-উপাত্ত, কাহিনি আর যুক্তিরও কমতি থাকে না। সিনেমার গল্পের অসংগতি, কাহিনির নকল ধরিয়ে দেওয়া কিংবা অশালীন সংলাপ নিয়ে কাটাছেঁড়া যেমন চলে, তেমনি আয়নাবাজির মতো সফল ছবির প্রশংসা, গল্পের প্রয়োজনে আরিফিন শুভর পরিশ্রম কিংবা নায়করাজ রাজ্জাকের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে তথ্যচিত্রও রয়েছে ইউটিউবের আরএনএআর চ্যানেলে।

বিজ্ঞাপন

জীবনটাই যেন সিনেমা

সিনেমাপ্রেমী রাকিবের জীবনটাই যেন একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। জীবনের অনেক ঘটনা, উত্থান-পতনের সঙ্গী সিনেমা। ছোটবেলা থেকে সুযোগ পেলেই বসে পড়তেন সিনেমা দেখতেন। সময়টা ২০০৪–০৫ সাল হবে। শুক্রবারে বিটিভিতে দেখানো সিনেমাই ছিল একমাত্র ভরসা। সিনেমার দেখার পর স্কুলে গিয়ে সেটির কাহিনি মজা করে বন্ধুদের কাছে বলতেন। রাকিব বললেন, ‘সিনেমার কাহিনিগুলো সাধারণভাবে বললে কেউ শুনতে আগ্রহ দেখাত না। তাই বলার সময় বাড়তি রস যোগ করে বলতাম, তখন সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেত।’

রাকিব তাঁর ইউটিউব ভিডিও বানানোর ক্ষেত্রেও এই বিষয় অনুসরণ করেন। তাঁর মতে, ভিডিও তৈরির সময় তিনি অন্য এক চরিত্রে বসবাস শুরু করেন, যা আসল রাকিবের চেয়ে আলাদা। ‘বাস্তবে তো আমি লাজুক, শান্ত প্রকৃতির। তবে ইউটিউবে আমি বদলে যাই। ওখানে আমি বেশ চটপটে। কথাও বলি ভিন্নভাবে’, বললেন রাকিব।

default-image

শুরুটা চার বছর আগে

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আরএনএআর নামে তাঁর এই ইউটিউব চ্যানেলটি খোলা হয়। মোট ১৪৩টি ভিডিও রয়েছে চ্যানেলে। ভিডিওগুলো ৮ কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে। আর গ্রাহক ৮ লাখের বেশি। চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপংকর দীপন, টিভি ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার, অভিনেতা কাজী মারুফসহ অনেকেই রাকিবের প্রশংসা করে নিজেদের ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে রাকিবের ভিডিও শেয়ার করেছেন। এ ছাড়া ইনবক্সে পেয়েছেন অনেক বিখ্যাত মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসা।

যদিও ইউটিউব ক্যারিয়ারের শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার গল্প আছে রাকিবের। ২০১৬ সালে একই নামে নিজের প্রথম ইউটিউব চ্যানেল খুলেছিলেন রাকিব। কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রাহকসংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল। তবে হঠাৎ একদিন সকালে রাকিব আবিষ্কার করলেন, তাঁর ইউটিউব চ্যানেলটি বেহাত (হ্যাকড) হয়ে গেছে। রাকিব বললেন, ‘তখন আমি সপ্তাহখানেক ঘর থেকে বের হইনি। আতঙ্কে ইউটিউবেও ঢুকতে ভয় পেতাম। কিন্তু তারপর সিনেমাই আমাকে আবার হতাশা থেকে মুক্তি দিয়েছে। দ্য স্কিন আই লিভ ইন, নো মার্সির মতো কিছু সিনেমা থেকে আমি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’ আবার ইউটিউবে নতুন করে ফিরে আসেন রাকিব।

এরপর থেকে নিয়মিত প্রতি শুক্রবার নতুন ভিডিও প্রকাশ করেন। একটি ভিডিও বানাতে অনেক সিনেমা দেখতে হয় তাঁকে। যেন তাঁর যুক্তি শক্তপোক্ত হয়। প্রতিটি ভিডিওতে একাধিক সিনেমার অংশও ব্যবহার করেন। রাকিব জানালেন, আরিফিন শুভকে নিয়ে বানানো একটি ভিডিওতে আলোচনার সঙ্গে মিলিয়ে ৭০টি সিনেমার অংশ ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে শাকিব খানের পাসওয়ার্ড সিনেমার পর্যালোচনামূলক ভিডিওতে রয়েছে ৬৪টি সিনেমার অংশ।

বিজ্ঞাপন

রুটিন ধরে কর্মযজ্ঞ

একটি ভিডিওর জন্য ক্যামেরার সামনে আর পেছনে ৭০ থেকে ৮০ ঘণ্টা ব্যয় হয় রাকিবের। তাঁর সাপ্তাহিক কর্মতালিকা সাজানো। ভিডিও প্রকাশের পরদিন শনিবার কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পরিবারকে সময় দেন। এরপর রোববার পরের ভিডিওর বিষয় নিয়ে ভাবেন। বিষয় নির্ধারিত হয়ে গেলে তা নিয়ে দিনভর গবেষণা শুরু করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খাতায় বা কম্পিউটারে টুকে রাখেন। সোমবারজুড়ে লেখেন ভিডিওর চিত্রনাট্য। ওই দিন মধ্যরাতে ভয়েস ওভার বা ভিডিওর নেপথ্য কণ্ঠ দেন। পরদিন সকালে ভয়েস সম্পাদনা করেন।

বুধ, বৃহস্পতি আর শুক্রবারে ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা আর আপলোডের জন্য বরাদ্দ রাকিবের। ভিডিওর পেছনের সব কাজই রাকিব একাই করেন। তবে একটু লাজুকভাবে হেসে বললেন, ‘আমি সব কাজ একা করতেই পছন্দ করি। তবে বিয়ের পর থেকে আমার স্ত্রী নিগার শুটিংয়ের সময় সাহায্য করে।’ ২০১৯ সালে বিয়ে করেছেন রাকিব।

সাধারণত শুক্রবার দুপুরের মধ্যে রাকিবের ভিডিও তৈরি হয়ে যায়। এরপর সেই ভিডিও পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখতে বসেন। কোনো অংশ নিয়ে কেউ কোনো আপত্তি তুললে সেটি ফেলে দেন। রাকিব বলেন, ‘আমার পরিবার হলো আমার কাছে সেন্সর বোর্ডের মতো। তাই আমি আমার পরিবারকে নিয়ে আগে ভিডিওটা দেখি। কারণ, আমি সব সময় এমন কিছু বানাতে চাই,
তা যেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখার
উপযোগী হয়।’

পর্দায় সুদিনের স্বপ্ন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর রাকিব নতুন ধারার এই পেশা বেছে নিয়েছেন নিজেই। ইউটিউব আর সিনেমাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। এর বাইরে ক্রিকেট নিয়েও বেশ আগ্রহ রয়েছে। ক্রিকেটভিত্তিক একটি অনলাইন পোর্টালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার কাজ করেন। জানালেন, ক্যামেরার সামনে আসতে আগ্রহী নন তিনি। অন্য কোনো পেশায় যেতে চান না; বরং ক্যামেরার পেছনে থেকেই সিনেমা নিয়ে ভিডিও বানাতে চান। তাঁর বিশ্বাস, সাধারণ মানুষই সুপার‍্যান কিংবা স্পাইডারম্যানের মতো সুপারহিরো হয়ে বাঁচাতে পারে আমাদের সিনেমাকে। তিনি বলেন, এই উন্নতির জন্য আলোচনা-সমালোচনা দরকার। এটা না থাকলে উন্নতি সম্ভব নয়। যদি আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়, তাহলে এ দেশের রুপালি পর্দায় আবারও সুদিন ফিরে আসবে।

প্র ছুটির দিনে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন